“মাতৃভাষা বাংলা তো?”

আমরা বাংলাদেশি তার থেকেও বড় পরিচয় আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা তাই বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের অন্যরকম টান ও ভালোবাসা রয়েছে।
বিশ্বের প্রায় ২৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা পঞ্চম স্থানে রয়েছে। বাংলা ভাষা মূলত বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামের প্রধান ভাষা। ইন্দো আর্য এই ভাষাটা আজ থেকে প্রায় ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকশিত হয়ে সমৃদ্ধ সাহিত্য ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হয়েছে। এই ভাষাটিকে বিশ্বের অন্যতম সুমধুর ও বহুল প্রচলিত ভাষা ধরা হয়।
বর্তমানে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবি ছাড়াও অনেক ভাষার সাথে বাঙালি পরিচিত। অনেকে এখন বিভিন্ন কাজে এবং শখের বশে বিভিন্ন ধরনের ভাষা শিখছেও। ভাষা গুলোর মধ্যে কোরিয়ান, জাপানিজ, মান্দারিন (চাইনিজ), স্প্যানিশ, ফরাসি, ইতালিয়ান, জার্মান ভাষা অন্যতম। কিন্তু এক পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচুর অপব্যবহার করে ফেলছি আমরা বাঙালি জাতি।
ইংরেজি আমাদের আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি ভাষার ব্যাপক ব্যবহার হয়। কিন্তু বর্তমান জেনারেশন এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের সুবিধার্থে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলিশ ভাষা তৈরি করেছে। এর কিছু বাস্তব উদাহরণ আমরা দৈনন্দিন জীবনে দেখতে পাচ্ছি। যেমন: ‘কেমন আছেন?’ বাক্যটিকে ‘Kemon achen?’ এভাবে লিখা হচ্ছে। এতে কথোপকথন সহজ ও দ্রুত হচ্ছে কিন্তু এটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে শুদ্ধ বাংলা লেখার প্রতি অনীহা তৈরি করছে এবং মূল বর্ণমালার গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে।
আবার অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন বিনোদনমূলক কন্টেন্টে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য অথবা মজার ছলে অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করছে। এতে ভাষার সাংস্কৃতিক ও মার্জিত রূপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন: ‘মারা’, ‘শালা’, ‘হোগামারা’ ইত্যাদি অমার্জিত শব্দের ব্যবহার।
সঠিক বাংলা শব্দ জানা থাকা সত্ত্বেও বিনা কারণে ইংরেজি বা হিন্দি শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার এক ধরনের অপব্যবহার। এতে বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার অবহেলিত হচ্ছে।এতে আমরা কিছু বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি শব্দের বাংলা শব্দার্থ খুঁজে পাচ্ছি না। যেমন: Notebook(নোট খাতা), Suggestion(সাজেশন), Content(কন্টেন্ট), Vlog(ব্লগ), Season(সেশন), Call(কল) ইত্যাদি।
বাংলা ভাষা সুসংগঠিত ব্যাকরণ, ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষার শব্দ অন্তর্ভুক্ত এবং বাংলা ও পশ্চিম কেন্দ্রীয় উপভাষার সংমিশ্রণে গঠিত একটি সমৃদ্ধ ভাষা। কিন্তু আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাব যে, বাংলা লিখন পদ্ধতিতে বিশেষ করে বানানে প্রচুর ভুল দেখা যায়। যেমন: ‘ণ’ ও ‘ন’, ‘শ’, ‘ষ’ ও ‘স’, এবং ই-কার ও ঈ-কারের ভুল প্রয়োগ। যেমন: পরীক্ষা না লিখে পরিক্ষা, পরিষ্কার না লিখে পরিস্কার লিখা হয়। এতে ভুল হচ্ছে বোঝা সত্ত্বেও “আরে দুটোই একই” বলে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি।
বেতার, টেলিভিশন এবং বর্তমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় বাংলাকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইংরেজি টানে বা বিদেশি ঢঙে উচ্চারণ করা হয়, যা ভাষার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট করে।
ভাষার যান্ত্রিক ব্যবহার এবং যতিচিহ্নের অপপ্রয়োগে বাংলা ভাষা তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারাচ্ছে। যেমন: “আমি যাব না তুমি যাও”(কমার ব্যবহার হয়নি বিধায় দুটো বাক্য আলাদা করা মুশকিল), “কি??!!”(একাধিক যতি চিহ্নের ব্যবহার), করব(অটো টাইপ এর ফলে ‘করবো’ হয়ে যায়) ইত্যাদি ভাষার স্থায়িত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বর্তমানে কে-ড্রামা ও কে-পপ কোরিয়ান ভাষা, সি-ড্রামা চাইনিজ ভাষা, পি-ড্রামা উর্দু ভাষা, আনিয়ে(Anime) জাপানিজ ভাষাকে আকর্ষণ করছে। শখের বশত হলেও বাংলা ভাষার উপর এসব ভাষা কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে।
ভুলে গেলে চলবে না যে ১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি অসংখ্য বীর শহীদরা আত্মত্যাগ করেছে কেবল মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার্থে। ভাষা চেতনার অনিবার্য ফলস্বরূপ পাকিস্তানের মাটিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। কারণ সেদিন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার উপলব্ধি থেকেই সাধারণ জনগণের মননে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অঙ্কুরিত হয়। আর এর ফলে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে পারছে। বস্তুত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার স্বতন্ত্র বিকাশের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছিল।
যাই হোক না কেন মাতৃভাষা ব্যতীত আর কোনো ভাষায় নিজের মনের ভাষা পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। দিনশেষে আমরা বাঙালি জাতি বাংলা ভাষাতেই নিজেদের স্বস্তি খুঁজে পাই। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত এই ভাষার সঠিক ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বাংলা ভাষার অপব্যবহার রোধে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। অতিরিক্ত বিদেশি ভাষা যেনো মিশে না যায় বাংলা ভাষায় সেই দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের উচিৎ সবসময় মাতৃভাষার সৌন্দর্য, মার্জিত রূপ, সংস্কৃতি বজায় রাখা।

