ডিজিটাল যুগে স্প্যাম হতে নিরাপত্তা ও সচেতনতা

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। হাত-পা ছাড়া মানুষ যেমন অসম্পূর্ণ, ঠিক তেমনি বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া মানুষের জীবনও অনেকাংশে অসম্পূর্ণ। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, শিক্ষাগত ও অফিসিয়ালসহ নানাবিধ কাজে আমরা মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার করি।
এক সময় খাতা-কলম ছিল তথ্য সংরক্ষণের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। তখন মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার কিংবা আধুনিক কোনো তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তি ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতিতেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বর্তমানে মোবাইল ফোন আমাদের নিত্যসঙ্গী। দৈনন্দিন জীবনের ছোট-বড় নানা ঘটনা, প্রয়োজনীয় তথ্য, ছবি, ভিডিও এমনকি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাসওয়ার্ডের মতো স্পর্শকাতর তথ্যও আমরা মোবাইলে সংরক্ষণ করি।
বর্তমান যুগে তথ্যকেই সম্পদ বলা হয়। আর এই সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য অনলাইনে সদা তৎপর থাকে একদল অসাধু চক্র। তাই ডিজিটাল যুগে আমাদের তথ্য নিরাপদ রাখতে ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অ্যাপে অনুমতি দেওয়ার আগে সতর্ক হওয়া: আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে মোবাইল বা কম্পিউটারে নানা ধরনের অ্যাপ ডাউনলোড করি। এসব অ্যাপ ব্যবহার করার সময় বিভিন্ন পারমিশন বা অনুমতি চাওয়া হয়। অনেকেই না পড়েই এসব অনুমতি দিয়ে দেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোনো অ্যাপ তার কার্যক্রমের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুমতি চাইলে সতর্ক হতে হবে। যেমন- একটি ক্যালকুলেটর অ্যাপ যদি কন্টাক্ট লিস্টের অনুমতি চায়, তবে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে।
অপরিচিত ই-মেইলের লিংকে ক্লিক না করা: অনেক সময় অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ই-মেইল বা মেসেজে বিভিন্ন লিংক আসে। যাচাই না করে এসব লিংকে ক্লিক করলে ফিশিংয়ের শিকার হয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হারানোর ঝুঁকি থাকে।
লোভনীয় বিজ্ঞাপন এড়িয়ে চলা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার বা বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক চক্র এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। তাই অপরিচিত বা অবিশ্বস্ত উৎসের বিজ্ঞাপনের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে।
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা: বিভিন্ন অনলাইন অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা জরুরি। অনেকেই নিজের নাম, জন্মতারিখ বা সহজ সংখ্যা ব্যবহার করেন, যা খুবই দুর্বল পাসওয়ার্ড। নিরাপদ পাসওয়ার্ড তৈরির জন্য বড় ও ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা এবং বিশেষ চিহ্নের সমন্বয় ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা ভালো।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা: জিমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখলে নিরাপত্তা অনেক বৃদ্ধি পায়। পাসওয়ার্ড ফাঁস হয়ে গেলেও ওটিপি ছাড়া অন্য কেউ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে না।
সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট করা: আমরা অনেক সময় মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে সফটওয়্যার আপডেটের নোটিফিকেশন পেলেও তা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এই আপডেটগুলোর মাধ্যমে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি সংশোধন করে থাকে। পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করলে হ্যাকাররা সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ডিভাইসে প্রবেশ করতে পারে। তাই সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারে সতর্ক থাকা: বর্তমানে রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, রেলস্টেশন, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ থাকে। অনেকেই এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ কাজ যেমন- ব্যাংকিং লেনদেন, পাসওয়ার্ড লগইন কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান করেন। কিন্তু অনেক পাবলিক ওয়াই-ফাই নিরাপদ নয়। হ্যাকাররা এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর তথ্য চুরি করতে পারে। তাই পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময় সংবেদনশীল কাজ বা পাবলিক ওয়াইফাই-ই ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত।
অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করা: ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় অনেক সময় অজান্তেই আমাদের ডিভাইসে ভাইরাস, ম্যালওয়্যার কিংবা ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করতে পারে। এগুলো ডিভাইসের ক্ষতি করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতেও সক্ষম। তাই কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে নির্ভরযোগ্য অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি সেটি নিয়মিত আপডেট করাও জরুরি, যাতে নতুন ধরনের ভাইরাস থেকেও সুরক্ষা পাওয়া যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সীমিত শেয়ার করা: বর্তমানে অনেকেই ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য শেয়ার করেন। যেমন- ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয় পত্র নম্বর, দৈনন্দিন অবস্থান, ভ্রমণের পরিকল্পনা ইত্যাদি। এসব তথ্য অসাধু ব্যক্তিদের হাতে গেলে তারা বিভিন্নভাবে অপব্যবহার করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সচেতন ও সংযত থাকা প্রয়োজন।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সতর্ক থাকা: বর্তমানে সময় বাঁচাতে অনেকেই বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন। প্রতারক চক্র প্রায়ই ফোন করে নিজেদের এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড জানতে চায়। মনে রাখতে হবে, কোনো মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কখনো গ্রাহকের কাছে ওটিপি বা পাসওয়ার্ড চায় না। তাই এসব তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না।
লগআউট করার অভ্যাস গড়ে তোলা: অনেক সময় আমরা বন্ধুদের মোবাইল বা অফিসের কম্পিউটারে নিজেদের ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য অ্যাকাউন্টে লগইন করি। কাজ শেষে অনেকেই লগআউট করতে ভুলে যান। এর ফলে অন্য কেউ সহজেই সেই অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে অপব্যবহার করতে পারে। তাই অন্যের ডিভাইসে লগইন করলে কাজ শেষে অবশ্যই লগআউট করতে হবে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রযুক্তি যেমন উন্নত হচ্ছে, তেমনি অপরাধের ধরনেও যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। তাই ডিজিটাল যুগে নিরাপদ থাকতে হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখা ও সতর্ক থাকার কোন বিকল্প নেই।

