বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন ও বাঙালি সমাজের সাম্প্রদায়িক বিভাজন

বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন ও বাঙালি সমাজের সাম্প্রদায়িক বিভাজন
বাংলা ভাষায় ‘জল’ এবং ‘পানি’ শব্দ দুটির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক বা সামাজিক বিভাজনের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এটি যতটা না ভাষাতাত্ত্বিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়তাত্ত্বিক। গ্রাম-বাংলার সাধারণ মুসলমান সমাজের মানুষের কাছে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে পানি ও জলের মধ্যে পার্থক্য কি তখন তাদের উত্তর এই হয় যে পানি মুসলমানদের শব্দ আর জল হিন্দুদের শব্দ। বাংলার মুসলমান সমাজ এই জল শব্দ উচ্চারণ করাকে একপ্রকার গুনাহের কাজ মনে করে । কোনোভাবেই তারা এই জল শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নয়। তাদের প্রবল ধারণা যে জল শব্দ হিন্দু শব্দ আর পানি হলো মুসলমান শব্দ। অনেকই জল বলতে হিন্দুদের এক বিশেষ ধরণের পানীয় বলে ধারণা করে যা কেবল হিন্দুদেরই ধর্মীয় বস্তু। অন্যদিকে কলকাতার হিন্দু সমাজ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা মনে করে এই পানি শব্দটা মুসলমানদের দ্বারা বাংলা ভাষায় জোরপূর্বক ঢুকে পড়া একটা বিদেশী শব্দ। তারা প্রমান করতে চাই যে পানি শব্দটা উর্দু ভাষা থেকে আগত এক সাম্প্রদায়িক শব্দ। মুসলমান শাসকরা জোরপূর্বক এই শব্দকে আমদানি করেছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে বাংলা গদ্যের এক নতুন তৈরী হয়। মূলত তখন থেকেই হুন্দু ও মুসলমান সাহিত্যিকরা এই শব্দের বিভাজন শুরু করে। বিতর্কের এই বাইনারি আজও চলমান।
কলকাতার কট্টর হিন্দু এলিটরা এই অভিযোগ তুললেও এটা মোটেও সত্য কোনো দাবি নয়। পানি ও জল শব্দ দুটাই সরাসরি সংস্কৃত শব্দ থেকে আসা। শব্দ দুইটার উৎস কাল দেখলে দেখা যাই বরং পানি শব্দটা বাংলা ভাষার শুরু থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন চর্যাপদে পানি শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। চর্যাপদের ভুসুকপার ৬ নম্বর পদে উল্লেখ আছে :-
“তিণ ন চছুপইী হরিণা পিবই ন পাণী ।
হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জাণী ।। [ধ্রু] ।।”
অনুবাদ
“দুঃখী হরিণ খায় না সে ঘাস, পান করে না পানি,
জানে না যে কোথায় আছে তার হরিণী রানি।”
মধ্যযুগের আদি নিদর্শন বড়ু চন্ডিদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে ‘জল’ ও ‘পাণী’ (পানি) শব্দ দুটি একই পঙ্ক্তিতে সমার্থক শব্দ হিসেবে চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
“নাহিবারেঁ সখিগণ চাহে এহা জলে।
তবে নাহিঁ নাহে ডরে পাণী লআঁ চলে॥”
অনুবাদ
সখীগণ যমুনার এই জলে স্নান করতে চায়,
কিন্তু ভয়ে স্নান না করে কেবল কলসি ভরে পানি নিয়ে চলে যায়।
মধ্যযুগের অন্যান্য সাহিত্য (পঞ্চদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী) বৈষ্ণব পদাবলি এবং মঙ্গলকাব্যগুলোতেও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব কবি অবলীলায় ‘পানি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। নদীর স্রোত, বৃষ্টির প্রতিশব্দ বা পান করার জল বোঝাতে ‘পানি’ বা ‘পাণী’ সেসময় সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা ছিল। বুৎপত্তিগতভাবে সংস্কৃত ‘পানীয়’ > প্রাকৃত ‘পাণিঅ’ > বাংলা ‘পানি’ বা ‘পাণী’। শুধু বাংলা নয়, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্যান্য ভারতীয় ভাষা, যেমন— হিন্দি, ওড়িয়া, গুজরাটি, মারাঠি ও অসমীয়াতেও এই সংস্কৃত মূল থেকেই ‘পানি’ শব্দটি এসেছে। অন্যদিকে জল শব্দ সরাসরি সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে।
এর থেকে বোঝা যায়, হিন্দু পন্ডিতদের দাবি পানি শব্দ উর্দু থেকে আগত এই কথাটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্য প্রনোদিত। এটি কোনো নতুন শব্দ না বরং বাঙলা ভাষার জন্ম থেকেই এই শব্দের ব্যবহার হয়ে আসছে। হিন্দু পন্ডিতরা কট্টর সাম্প্রদায়িকতার করণেই এই দাবি তুলে মুসলমানদের উপর বিদ্বেষমূলকভাবেই এই অভযোগ চাপিয়ে দেয়।
আবুল মনসুর আহমদ তার বাংলাদেশের কালচার বইয়ে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগীয় আমলে কিভাবে পূর্ববাংলাবিদ্বেষ ছড়িয়ে পরে তার যমুনা তুলে ধরেছেন। যেমন সেই যুগের একটু সংইস্কৃত শ্লোক হলো-
‘আশির্বাদং ন গৃহিয়াত পূর্ব বঙ্গ নিবাসিন,
শতায়ূবীতি বক্তব্যে হতায়ুর্বদতি যতঃ।’
অর্থাৎ পূর্ব বাঙালির আশীর্বাদ গ্রহণ করিও না। উহারা শতায়ু হউক বলিতে গিয়া হতায়ু বলিয়া ফেলে। তারপর ধীরে ধীরে এই পূর্ব বাংলা বৈরিতা এত চরম আকার ধারণ করে যে পশ্চিম বাংলার মানুষেরা পূর্ব বাংলার মানুষদের তাচ্ছিল্যভরে একটা প্রবচন বলতে থাকে –
‘বাংলার মনুষ্য নয় উড়ে এক জন্তু,
লাফ দিয়ে গাছে উঠে লেজ নেই কিন্তু’
গোড়ার দিকে এই পূর্ব বাংলা বিরোধী মনোভাব কিন্তু মুসলিম বিরোধী ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে মুসলিম বিদ্বেষী রূপ নেয়।
চৈতন্যবাদ ছিল মূলত হিন্দু রেনেসাঁ আন্দোলন। এই রেনেসাঁ সফল করতে প্রথমেই প্রয়োজন ছিল হিন্দু মানসকে পাঁচশত বছরের মুসলিম প্রভাবমুক্ত করা। এই ভাবের প্রথম উন্মেষ দেখা যাই আঠারোশতকের শুরু থেকেই। হিন্দু পন্ডিতরা বাংলা ব্যাড দিয়ে সংস্কৃত ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে থাকে। আরবি ফার্সি শব্দ বর্জনের প্রবণতা লাভ করে। বাংলায় আরবি ফার্সি শব্দ থাকলেও সেগুলো বাংলার লক্যালয়েড রূপেই বাঙালিরা ব্যবহার করতো। অনেক ক্ষেত্রে বুজাই দুস্কর ছিল যে ইটা আরবি ফার্সি শব্দ। কিন্তু হিন্দু পন্ডিতরা এই শব্দগুলোকে সচেতনভাবেই বাদ দিতে থাকে এবং কবিতা সাহিত্যে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করে কবিতা সাহিত্যের বিষয়াবলিতে হিন্দুয়ানী ভাব প্রয়োগ করতে থাকেন। মুসলিম বিদ্বেষী বা পূর্ববঙ্গ বিদ্বেষী মনোভাবের বীজ মূলত মদ্ধযুগেই বপিত হয়। এবং এর পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে উনিশ শতকের শুরু থেকে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রচলিত বাংলাকে পাঁচশত বছরের আরবি ফার্সি শব্দমুক্তকর শুরু হয় পরিকল্পিতভাবেই।
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্টার পর থেকেই বাংলা সাহিত্যে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা প্রকৃত দৃশ্যমান হয় হিন্দু পন্ডিতদের লেখাজোখার মাধ্যমে। ব্রিটিশ ও হিন্দু পন্ডিতরা বাংলা ভাষা থেকে আরবি ফার্সি শব্দ বাদ দিয়ে কেবলমাত্র সংস্কৃতঘেঁষা শব্দ দিয়ে বাংলা ভাষাকে শুদ্ধ করার নামে নতুন ধারার এক সাম্প্রদায়িক বাংলা ভাষা তৈরী করে। অন্যদিকে মুসলমানরা আরবি ফার্সি শব্দের মিশ্রনেই তাদের সাহিত্য রচনা করতে থাকে। ফলে সৃষ্টি হয় দুই ধারার বাংলা ভাষা। কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য লিখিত ও মৌখিক ভাষায় সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য আর মুসলমানরা সেই আরবি ফার্সি শব্দের মিশ্রিত বাংলা ভাষায় তাদের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা করতে থাকে। হিন্দু সাহিত্যিক ও পন্ডিতরা তাদের গদ্য ও পদ্যে এই সাম্প্রদায়িক ভাষা বেবহার করতে থাকে। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্র সাহিত্য দেখলে বোঝা যায় যে ভারতীয় উপমহাদেশে কখনোই মুসলমানদের অবস্থান ছিল না। ব্রিটিশ ও হিন্দু পন্ডিতরা বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী বাংলা ভাষা বানিয়ে ফেলতে থাকে যাতে পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজকে সম্পূর্ণ বিয়োগ করা হয়। রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্যিক জীবনের বড় একটা সময় বাংলার মুসলমান সমাজের সাথে কাটালেও তার সাহিত্যে বাংলার জীবনাচার নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান ছোয়া পাওয়া যায় না। তার সাহিত্য মূলত কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। এভাবে হিন্দু পন্ডিত ও সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষা থেকে আরবি-ফার্সি শব্দ মুছে দিয়ে শুধুমাত্র সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা ভাষা তৈরী করে সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্য থেকে আরবি ফার্সি শব্দের ব্যবহার ও বাংলার মুসলমানদের মৌখিক ভাষার বিকৃতি করে নতুন ধারার একটা ভাষা তৈরী করে সাধারণ মুসলমান সমাজের উপর সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। আরবি ফার্সি মিশ্রিত বাংলা ভাষাকে নিম্ন শ্রেণীর মানুষের ভাষা বলে আক্ষায়িত করে। এভাবেই হিন্দু পন্ডিতরা বাংলা ভাষাকে প্রমিত ভাষা করণের নামে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালাতে থাকে মুসলমানদের উপর। তারা এই নতুন ধারার বাংলা ভাষাকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখতে থাকে তারা এবং জনমনে এই ধারণা সুচারুভাবে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের সময় রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িত্তক দানা বাধলে ভাষাকেন্দ্রিক এই বিতর্ক আরো প্রবল আকার ধারণ করে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ‘সংস্কৃতায়ন’ নীতি অনুযায়ী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের বাংলা শেখানোর জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে একটি পাঠ্যক্রম তৈরি করা হয়। এই কলেজের প্রধান পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং পরবর্তীতে উইলিয়াম কেরি যখন বাংলা গদ্যের কাঠামো তৈরি করেন, তখন তারা ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার জন্য সংস্কৃতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে শুরু করেন। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের ‘বত্রিশ সিংহাসন’ (১৮০২) বা ‘রাজাবলী’ (১৮০৮) বইগুলোতে ফারসি বা আরবি শব্দগুলোকে সচেতনভাবে বাদ দিয়ে তৎসম (সংস্কৃত) শব্দ ঢোকানো হয়। তারা ‘পানি’ শব্দটিকে ‘যবন’ (বিদেশি) বা ম্লেচ্ছদের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং এর পরিবর্তে কথিত সংস্কৃতজাত ‘জল’ শব্দটিকে প্রাধান্য দেন। হিন্দু পণ্ডিতরা তাদের রচনায় এমন এক সংস্কৃতঘেঁষা ভাষারীতি প্রবর্তন করেন, যা বাংলার প্রাকৃত, দেশজ ও মুসলিম সমাজে প্রচলিত আরবি-ফারসি প্রভাবিত শব্দভাণ্ডারকে সচেতনভাবে পরিহার করে। ফলে যে গদ্যরীতি গড়ে ওঠে, তা ছিল কৃত্রিমভাবে নির্মিত—জনজীবনের ভাষা নয়, বরং শিক্ষিত উচ্চবর্ণ হিন্দু সমাজের ভাষিক রুচির প্রতিফলন। মুহাম্মদ এনামুল হক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ও প্রশাসনিক নথিপত্রে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যাপক ব্যবহার ছিল, যা বাংলার মুসলিম সমাজের ভাষিক অবদানের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ-পরবর্তী ভাষা-সংস্কারে এই ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা হয় এবং বাংলা ভাষাকে একটি ‘সংস্কৃতায়িত’ রূপে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। ব্রিটিশ ও হিন্ধু পন্ডিত ও সাহিত্যিক কর্তৃক বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন সম্পর্কে ও পক্ষপাতমূলকভাবে আরবি ফার্সি শব্দের পরিহার সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায় ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হকের লেখা থেকে। তিনি বলেন : “হিসাব করে দেখা গেছে, যে ভাষা আমাদের নামজাদা সাহিত্যকরা তাদের লেখায় ব্যবহার করছেন, তার শতকরা দুটি অনার্য, পঁচিশটি সংস্কৃত-আধা সংস্কৃত, ষাটটি সংস্কৃত থেকে ভেঙ্গে সোজা করে নেওয়া আর আটটি হচ্ছে বিদেশী অর্থাৎ আরবী, ফারসী, পর্তুগীজ, ইংরেজী প্রভৃতি।”
এখানে দেখা যায়, জীবন্ত কথ্যভাষার পরিবর্তে সংস্কৃতমূলক শব্দের আধিক্য একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক মান তৈরি করেছে, যা বাংলার বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে না। বিশেষত, মধ্যযুগীয় বাংলা ও মুসলিম সমাজে প্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দভাণ্ডারের তুলনামূলক স্বল্প উপস্থিতি ভাষার ইতিহাসে ক্ষমতা ও সংস্কৃতির দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। এই প্রক্রিয়া কেবল ভাষাগত পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল সাংস্কৃতিক আদিপত্য বিস্তারের একটি উপনিবেশিক প্রকল্প, যেখানে ভাষাকে ব্যবহার করা হয় সামাজিক শ্রেণি ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। ফলে বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভাষিক ঐতিহ্য প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং বাংলা ভাষার ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। তথাপি, গ্রামীণ সমাজ, লোকসাহিত্য এবং মৌখিক সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে মুসলিম সমাজের ভাষা-ঐতিহ্য টিকে থাকে এবং পরবর্তীকালে তা আধুনিক বাংলা ভাষার বহুত্ববাদী চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের আধিপত্যকে অনেকেই ঔপনিবেশিক শাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় পাদ্রী ও ব্রাহ্মণদের যৌথ উদ্যোগের ফল হিসেবে দেখেন। পাদ্রী উইলিয়াম কেরী তার জীবনের শুরুতে দিনাজপুরে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারের কাজ করতেন। সেখানে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষা যেন একক নয়, বরং দুটি ভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি ছিল ব্রাহ্মণদের ব্যবহৃত সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা, আর অন্যটি ছিল আরবি-ফারসি মিশ্রিত বাংলা, যা প্রধানত মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ব্যবহার করত।
পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার তাকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে নিয়ে আসে। সেখানে তিনি আর শুধু ধর্মপ্রচারক নন, বরং একজন শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই অবস্থায় তিনি বাংলা ভাষার একটি ব্যাকরণ রচনা করেন। ১৮০১ সালে প্রকাশিত সেই ব্যাকরণের প্রথম সংস্করণে তিনি লিখেছিলেন যে, বাংলার দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহৃত হয়, এবং এগুলোকে ভাষাকে নষ্ট করার উপাদান না ভেবে বরং সমৃদ্ধির অংশ হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৮১৮ সালে প্রকাশিত একই ব্যাকরণের চতুর্থ সংস্করণে কেরীর অবস্থান বদলে যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন যে বাংলা ভাষার প্রায় আশি শতাংশ শব্দই সংস্কৃত উৎস থেকে এসেছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের পেছনে অনেক গবেষকের মতে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব কাজ করেছিল। এর ফলে কেরী বাংলাকে ক্রমশ সংস্কৃতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ভাষা হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন এবং বলেন যে ভারতীয় অন্যান্য ভাষার তুলনায় বাংলা সংস্কৃতের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ, এমনকি ভাষার চার-পঞ্চমাংশ শব্দই সংস্কৃতজাত।
এদিকে ঐতিহ্যগতভাবে সংস্কৃত পণ্ডিতদের মধ্যে বাংলার প্রতি একধরনের অবজ্ঞা ছিল। কিন্তু ইউরোপীয়রা যখন প্রথম দিকে বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, তখন তারা সরাসরি পণ্ডিতদের সংস্কৃতঘেঁষা ভাষাকে অনুসরণ করেননি। বরং তারা সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত কথ্য বাংলাকে সামনে রেখে ভাষার ব্যাকরণিক কাঠামো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।
এভাবে ব্রিটিশ-হিন্দু পন্ডিত ও সাহিত্যিকরা সচেতনভাবে আরবি ফার্সি শব্দসমূহ পরিহার করে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করে একটা উপনিবেশিক ভাষা সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেয়। যেমন আদালত থেকে বিচারালয়, দরবার থেকে সভা, খবর থেকে সংবাদ, হুকুম থেকে আদেশ ও দাওয়াত থেকে নেমন্তন্ন এভাবে সচেতনভাবে বাংলা ভাষায় নতুন এক ধারা তৈরী করতে সমর্থ হয়। এবং তারা এটা ব্যাপক ভাবে প্রচার করে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয় যে তাদের এই আধুনিক ভাষা হলো আভিজাত্যের প্রতীক এবং এটাই প্রকৃত শুদ্ধ বাংলা ভাষা আর আরবি ফার্সি মিশ্রিত ভাষা হলো বাঙালিদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া ভাষা এবং আরবি ফার্সি শব্দগুলো হলো ম্লেচ্ছদেশীয় ভাষা।
এর প্রভাব বাঙালি কবি সাহিত্যিকদের মাঝে অনেক গভীরভাবেই পড়ে। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, অধিকাংশ আধুনিক সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যকর্মে ‘কিতাব’ শব্দের পরিবর্তে ‘গ্রন্থ’ লিখতে সাচ্ছন্দবোধ করেন। কিতাব শব্দখানা যেন এক অমর্যাদাকর নিম্নশ্রেণীর শব্দ।
পরিশেষে এটা প্রতীয়মান যে ফোর্ট উইলিয়ামের পন্ডিতদের হাত দিয়ে যে নতুন ধারার সাম্প্রদায়িক ভাষা তৈরী হলো তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও তাদের সংস্কৃতিই প্রধান হয়ে উঠলো। ধারণাটা এমন দাঁড়ালো যে বাঙালি শব্দটাই যেন হিন্দুদের একটা সমর্থক শব্দ এবং বাঙালি শব্দটাই তারা একপ্রকার আত্মসাৎ করে বসলো। বাংলাভাষী হয়েও মুসলমানরা পৃথক এক গোষ্ঠীতে পরিণত হলো এবং তাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদে মুসলমানরা স্থানই পেল না ও মুসলমান সমাজকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে নাই করে দিয়ে তাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ভিতকে ধসিয়ে দিল।
লেখা: জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zahid.ss.du@gmail.com

