নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ
https://epaper.protidinersangbad.com/?date=2026-08-11&page=4&news=04_101
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট বিশ্বকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। একসময় যে দেশগুলো তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভর করেই উন্নয়নের পথ খুঁজেছে, তারাও এখন সৌর, বায়ু, জল ও বায়োমাসভিত্তিক জ্বালানিকে ভবিষ্যতের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত কমে আসছে এবং আমদানিকৃত এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার একটি উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের বড় অংশ গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত হয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করে এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বৃদ্ধি করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে জাতিসংঘের আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেল বারবার সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালা-ি নর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়ায় এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সৌরশক্তিতে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)- এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং প্রতিদিন গড়ে ৪-৬.৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা/বর্গমিটার সৌর বিকিরণ পাওয়া সম্ভব। এই ভৌগোলিক সুবিধা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্পদ। শহরের বহুতল ভবন, শিল্পকারখানা, সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ বাড়িগুলোর ছাদ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ এরই মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে নগর বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত করেছে। বাংলাদেশেও একই উদ্যোগ আরো বিস্তৃত করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুতের অপচয়ও হ্রাস পাবে। বাংলাদেশের সৌর হোম সিস্টেম কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সফল অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোগ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছে। বিদ্যুতের আলো পৌঁছানোর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হয়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোজ্য কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।এটি প্রমাণ করে যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ করে না; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌরশক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, পটুয়াখালী এবং সেন্ট মার্টিন উপকূলীয় এলাকায় বায়ুর গতি তুলনামূলক বেশি। স্রেডার বিভিন্ন সমীক্ষায় এসব অঞ্চলকে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ, বিশেষ করে ডেনমার্ক, জার্মানি ও চীন, বায়ুশক্তিকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিতভাবে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য বায়োমাস ও বায়োগ্যাস আরেকটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ধানের তুষ, খড়, আখের ছোবড়া, পাটের বর্জ্য এবং গবাদিপশুর বর্জ্য অব্যবহৃত থেকে যায়। এসব উপকরণ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ, জৈব সার এবং রান্নার গ্যাস উৎপাদন সম্ভব। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইরেনা) মতে, কৃষিভিত্তিক দেশগুলোতে বায়োমাস শক্তি শুধু কার্বন নিঃসরণ কমায় না; এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষুদ্র বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে কৃষকের জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশে বৃহৎ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সীমিত হলেও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি অঞ্চলের ছোট নদী ও ঝর্ণা ব্যবহার করে ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের ঢেউ, জোয়ার-ভাটা এবং সামুদ্রিক শক্তি নিয়েও গবেষণা চলছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রণীত সমন্বিত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি)-এ বিকল্প জ্বালানি উৎসের গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, নেট মিটারিং ব্যবস্থা, সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহক নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারছেন, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, সবুজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশও এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৭: সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) অর্জনের ক্ষেত্রেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে বায়ুদূষণ কমবে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য কেবল বিদ্যুতের বিকল্প উৎস নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
