স্বপ্ন দিশা
মো রেদোয়ান ইসলাম সিয়াম , গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ১৩৬ বার
স্বপ্নদিশা
হাইওয়ে তে একটি গাড়ি ও বাস সংঘর্ষ,,মানুষের ভিড়,, এম্বুলেন্স এর শব্দ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
প্রায় কিছু বছর পরের কথা,,,,,
আগড়াছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রথম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকছেন একজন শিক্ষক, আদিপ স্যার(বয়স ৩০ এর কাছাকাছি), দেখতে সিনেমার নায়কদের মতোই।শুধু বা পায়ে একটু সমস্যা আছে, হাঁটতে একটু সমস্যা হয়। অত্যন্ত ভালো মন,ভালো মানের শিক্ষক। বাচ্চারাও খুব ভালোবাসে। ৪ বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে আছেন।
এই বিদ্যালয়েরই অন্য একজন শিক্ষিকা সায়মা।খুব বেশি দিন হয় নি এই বিদ্যালয়ে এসেছেন। দেখতে সুন্দরী, বয়সটা ২৫-২৬ এর মতো। প্রথম থেকেই আদিপ স্যারের সততা,নিষ্ঠা,কাজ দেখে মুগ্ধ সায়মা।ধীরে ধীরে ভালোই বেসে ফেললেন। অনেকভাবেই আদিপ স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন কিন্তু কাজ হয়নি। আদিপ সব বুঝেও না বুঝার মতো করে থাকতো। সায়মা যতবারই তার আবেগের কথা প্রকাশ করতে গিয়েছে আদিপ তাকে এড়িয়ে যায়। দেখতে দেখতে বছর শেষ। নতুন বছরের আগমন।
আদিপের একটা প্রতিষ্ঠান আছে। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করে সেই প্রতিষ্ঠান এর নাম “স্বপ্ন দিশা” সেখানে পথশিশুদের লেখা-পড়া ও অন্যান্য দিক দেখাশুনা করা হয়। আদিপের প্রতিষ্ঠান এর চার বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।আদিপের কিছু সহকর্মীদের সাথে সায়মাও সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
দেখা গেলো দুটি কেকের আয়োজনের করা হয়। একটি প্রতিষ্ঠান এর নামে, আর একটি নামহীন। জিজ্ঞেসা করলে জানা যায় প্রতি বছরই এই দিনে দুটি কেক কাটা হয়। যাই হোক অনুষ্ঠানের শেষ দিকে সায়মা ভাবলো আজকে আদিপের মন ভালো। আজকেই সে আদিপকে তার মনের কথা জানাবে।
সায়মাঃ আদিপ, আপনার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। একটু গার্ডেনে আসুন। গার্ডেনে যাওয়ার পর,,,,,,
আদিপঃ কি এমন জরুরি কথা, যা ওখানে বলা গেলো না! বলুন, কি বলবেন?
সায়মাঃ আদিপ, আমি আপনাকে ভালোবাসি।
আদিপঃ (একটু হতাশার স্বরে), এটা সম্ভব নয়। আমার পক্ষে আপনাকে ভালোবাসা সম্ভব নয়।
সায়মাঃ কিন্তু কেন? আমি কি দোষ করেছি?( একটু কাদো কাদো অবস্থায়)
আদিপঃ দোষ আপনার নয়, দোষ আামার, আমার ভাগ্যের।
সায়মাঃ আজ আপনাকে বলতেই হবে,কেন আপনি আমাকে সবসময় উপেক্ষা করেন? বলতেই হবে, কেন ভালোবাসতে পারবেন না আমাকে?
বলুন! বলুন!
কিছুসময় চুপ করে থাকার পরে,,,,,,,,
আদিপঃ আমার একটা অতীত আছে, যে অতীত থেকে আমি আজও বের হতে পারিনি। আর সেই অতীতকে ভোলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
সায়মাঃ( বিস্মিত কন্ঠে) কি সেই অতীত! আমি জানতে চাই!
আদিপ কিছু সময় নিয়ে,
আদিপঃ তখন আমি উজিপুর জেলায় থাকি । উজিপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির মানবিক শাখার ছাত্র। আমাদের শহরে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে আব্দুল আলিম স্যার খুব পরিচিত। উজিপুর সরকারি বালক বালিকা উভয় স্কুলের ছাত্র ছাত্রী তার কাছে পড়ে । প্রতি দিনের মত আমি ও আমার বন্ধুরা 4.00টায় পড়ে বার হচ্ছিলাম। হঠাৎ কে যেন এসে ধাক্কা লাগিয়ে দিল। আমি ও সে দুই দিকে ছিটকে গিয়ে পরি । আমি একটু রেগে উঠে তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। এই প্রথমবার কাউকে দেখে কি রকম যেন একটা অনভুূতি হচ্ছে । সে ছিল একটা মেয়ে । সে একটু দুঃখিত বোধ করছে ।আমি তার রূপের চাইতে ও তার চোখ দেখে বেশি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তার চোখ দুটো যেন কথা বলে । সে কিছু বলার আগেই আমি বললাম “It’s ok”. Sorry বলার দরকার নাই। সে ইতস্তত হয়েই চলে গেল। আমরা পড়ে মাঠে খেলতে যাই। খেলার মাঠ কাছেই। ঘণ্টা খানেক পড়ে আমি আবার সব ভুলে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আবার সেই চোখ। আমি দেখলাম তার সাথে আমার বন্ধুর বোন। আমি বন্ধুকে বললাম খোজ নিতে । আর সাথে সাথে মেয়েটাকে ফলো করলাম। পরদিন জানতে পারলাম মেয়ে টার নাম দিশা। ওর বাবা সরকারি চাকরি করে । ওর বাবা বদলি হয়ে উজিপুরে আসার কারণে দিশাও এসেছে । দিশা নবম শ্রেণিতে গার্লস স্কুলে ভর্তি হয়ে ছে । আমি রোজ ওকে সামনে থেকে ফলো করতাম। আর মাঝে মাঝে পিছনে তাকিয়ে দেখতাম। আমি ওর বাসা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতাম। ও বাসায় ঢুকার পরে আমি আবার চলে আসতাম। এভাবে ই মাস খানেক চলল। এরপর একদিন জানতে পারলাম দিশা আমার সম্বন্ধে আমার বন্ধুর বোনের কাছে খোজ নিয়েছে । ১৬ই আগস্ট আমার জন্মদিন উপলক্ষে বন্ধুদেরকে ফুচকা খাওয়ানোর সময় বন্ধুর বোনকে ডাক দিলাম। দিশা ও সাথে ছিল। ফুচকা খাওয়ার সময় তার সাথে পরিচয়, খুনসুটি হয়। এরপর আর দূর থেকে নয় বরং রোজ ওর সাথে কথা বলতে বলতে যেতাম। ওর সাথে কথা বলার জন্য একটা মিথ্যা ও বলেছি যে আমার বাসা ওদের বাসা থেকে সামনে । কিন্তু ও আগে থেকেই জানতেো যে আমার বাসা ওদিকে ছিল না। এভাবেই চলতে থাকল। আমরা প্রায়ই ঘুরতে যেতাম। আমাদের মধ্যে অনেক ভালো সম্পর্কও তৈরি হল। আমার এসএসসি এর পরে আমি উজিপুরেই ভর্তি হয়েছি । ওর জন্মদিনে ওকে একটা পায়েল দিয়ে প্রপোজ করলাম। ও হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। শুধু মুচকি হাসল। আবার স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে শুরু করল। এভাবে ই ২০০৯ শেষ হয়ে ২০১০ শুরু হল। ওর এসএসসি পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট ভালো করেছে । হঠাৎ জানলাম ওরা আবার ঢাকা চলে যাচ্ছে । শেষবার দেখা করতে এসে সেদিন ও কিছুই বলেনি । ওর মনটা ও খুব খারাপ ছিল। দেখতে দেখতে তিনটি বছর কেটে গেল। ওর সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মূহুর্ত আমি খুব মিস করতাম। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার দুই বছর একটা স্কার্ফ পরা মেয়ের চোখের দিকে চোখ পরল। সেই চোখ। খুব চেনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে চলে গেল। তারপর দুই দিন আমি ঘুমাতে পারিনি । চোখ বুজলেই সেই চোখ। দুদিন পরে লাইব্রেরিতে আনমনা হয়ে বসে আছি । হাত থেকে পড়ে যাওয়া বই তুলতে গিয়ে তিনটি টেবিল সামনে বসা একটা মেয়ের পায়ের দিকে চোখ পরল। তার পায়ের পায়েলটা আমার খুব পরিচিত। এটা সেই পায়েল যেটা আমি দিশাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম। আমি চোখ বুজে জোনাকি বলে ডাক দিলাম। চোখ মেলে বুঝতে পারলাম স্কার্ফ পরা মেয়েটি আমার দিকে আসছে । হ্যাঁ, এটাই আমার দিশা। এরপর আমাদের রিলেশনশিপ শুরু হয়। অনেক ভালোভাবেই যেতে থাকে। আমাদের রিলেশনের ঐতিহাসিক জায়গা ছিল নদীর পাড়ে। নদীর পাড় ওর খুব প্রিয় ছিল। সময়ে অসময়ে আমরা নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতাম। কতো কথা, স্বপ্ন জড়িয়ে আছে ওই নদীকে ঘিরে!!!
রিলেশনের কয়েক মাস পরে আমার জন্মদিন আসে। বন্ধুদের নিয়ে ক্যাম্পাসেই কেক কাটার আয়োজন করি। ওই জন্মদিনে ও আমাকে একটা অদ্ভুত উপহার দেয়। একটা রুমাল। রুমালে কিছু কথা লেখা। সেইদিন কথাগুলো আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ওকে জিজ্ঞেস করলে ও বলেঃ যদি কোনদিন সময় আসে তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারবা! দেখো, রুমালটা আবার হারিয়ে ফেলো না! যদিও রুমালটা আমার কাছে অর্থহীন লাগলো, তবুও ওর দেয়া উপহার! তাই বাসায় নিয়ে রেখে দিলাম। কিন্তু কখনো কাজে লাগেনি।
জানেন, আমাদের রিলেশনে অনেকবার ওর সাথে আমার ঝগড়া হয়, আর ও মন খারাপ করে নদীর পাড়ে গিয়ে বসে থাকতো। কিছু সময় পর আমিও যেতাম। ওর রাগ ভাঙানোটা খুব সহজ ছিলো। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে আলতো চুমু খেলেই ও আমার হাত জরিয়ে ধরে আমার কাধে মাথা রেখে কেঁদে দিতো।
আমাদের মান অভিমান হতো ঠিকই কিন্তু কেউ কোনোদিন নিজেদেরকে ছেড়ে যাবার কথা ভাবতেও পারতাম না।
আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল, আমি চাকরি করে একটা গাড়ি কিনবো। ছুটির দিনে সেই গাড়ি করে Highway তে long drive এ যাবো।
আমার University শেষ হয়ে গেলো। একদিন ওর মন খারাপ ছিল।তো আমি একটা private car নিয়ে ওর বাসার নিচে হাজির হই। ওকে নিয়ে highway তে ঘুরতে বের হই। মাঝে মাঝে গাড়ি থামিয়ে চা, আইসক্রিম খেলাম। গাড়ির ড্রাইভার চাচাও ভালোছিল। তো চা খাওয়া শেষে আবারও গাড়ি চলতে থাকে। পিছনের ছিটে আমরা দুজন দুজনের হাত ধরে বসে আছি। কিন্তু হঠাৎ, কি যেন হলো! আমাদের হাত ছুটে যায়!
সাতদিন পরে আমার জ্ঞান আসে। জানতে পারলাম, সেদিন গাড়িটা বাসের সাথে accident করে। আমি সবার কাছে জানতে চাইলাম ও কোথায়? কেমন আছে ও? কিন্তু কেউ সাহস করে কিছু বলে উঠল না। এরপর এক ওয়ার্ডবয় এর কাছ থেকে জানতে পারলাম ও স্পটেই মারা যায়! কথাটা শুনে মনে হল, আমার পুরো পৃথিবী থমকে গেছে! কিছু শুনতে পাচ্ছি না, দেখতে পাচ্ছি না। আমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরি। বাবা, বন্ধুরা সবাই বোঝাতে থাকে! কিন্তু ওর চলে যাওয়া আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি রুমের সবকিছু তছনছ করতে থাকি। চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। আমার মনে হচ্ছিল, আমার চিৎকার করা কান্না শুনে ও ছুটে আসবে! কিন্তু কই? ও আসে নি। ঘরের জিনিসপত্র তছনছ করতে করতে আমার হাতে আসে জন্মদিনে ওর উপহার দেয়া সেই রুমাল। রুমালের লেখাগুলো আমি পড়ি…………
“সত্যিকারের ভালোবাসা কখনোই হারিয়ে যায় না। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে ভালোবাসার মানুষটা হারিয়ে গেলেও ভালোবাসা রয়েই যায়। তাই ভালোবাসার মানুষের ভালোলাগার জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিতে হয়। তাহলে ভালোবাসার মানুষটা যেখানেই থাকবে ভালো থাকবে”
কথাগুলো পড়ে সেদিন বুঝতে পারলাম, ও আমাকে এটাই বলতে চেয়েছিল যে, ও যদি কখনো হারিয়ে যায়, তাহলে আমি যেন ভেঙে না পড়ি। নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নি। ওর কথাগুলো ভেবে সিদ্ধান্ত নেই জীবনকে নতুন করে শুরু করব। তাতে ও খুশি হবে। ওর স্বপ্ন ছিল পথশিশুদের নিয়ে কাজ করার। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ওর স্বপ্ন আমি পূর্ণ করব। আর তাই এই organization গড়ে তোলা। আর আজ ওর জন্মদিন। তাই দুটি কেকের আয়োজন করা।
আমি দুঃখিত, সায়মা। আপনার ভালোবাসা আমি গ্রহণ করতে পারব না। ওর জায়গায় আমি অন্য কাউকে বসাতে পারবো না।
কথাগুলো শুনে সায়মাও নিশ্চুপ হয়ে যায়। কিছু সময় পর,,,
সায়মাঃ আমি চাই ওর জায়গা নিতে। আমি কখনো সেই অধিকার নিতে চাইবো না। আমি আপনার ভালোবাসা দাবিও করবো না। কখনে স্বামী -স্ত্রীর অধিকার ফলাতে চাইবো না। আমি শুধু আপনার পাশে থাকতে চাই৷ আপনার সুখ দুঃখ ভাগ করে নিতে চাই। আমাদের সম্পর্কটা চিরকাল না হয় বন্ধুত্বেরই থেকে যাবে। কিন্তু দয়া করে বিয়ে করতে অস্বীকার করবেন না।
আদিপঃ কিন্তু আমাকে বিয়ে করলে, স্বামী হিসেবে আমার দায়িত্ব আমি পালন করতে পারব না। তাতে আপনিও ভালো থাকবেন না।
সায়মাঃ না! দরকার নেই, আপনার দায়িত্ব পালন করার। আপনাকে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হবে না। আপনি যদি আমাকে বিয়ে না করেন তাহলে আমার পরিবার অন্য কোথাও আমার বিয়ে ঠিক করবে। যেটা আমার পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয়। আমার ধ্যান জ্ঞান শুধুই আপনাকে নিয়ে…..
কথাগুলো শেষ করে সায়মা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়।
সায়মার সেই হাহাকার, কান্না আদিপকে ভাবায়………
দিনের পর দিন যায়…. সায়মা চাকরিও ছেড়ে দেয়। বাসা থেকে বের হয় না। ঘরবন্দী হয়ে থাকে।
অবশেষে কিছু দিন পরে আদিপ সায়মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ওদের বিয়ে হয়। সায়মাও ঘরের কাজ সামলে আদিপের সাথে ওর organization এর কাজ করতে থাকে। ওরা আরও বড় পরিসরে কাজ শুরু করে। এর মধ্যে এক নবজাতক খুঁজে পায় ওরা। নামহীন পরিচয়হীন সেই শিশুটিকে নিজেদের কোলে জায়গা দিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করে। এভাবেই গল্প এগিয়ে যেতে থাকে।
লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।