বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মরুর বুকে আলোর কিরণ

Author

MD Moajjam Hussain , Sreemangal Govt College

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৪৮ বার

চকমকিয়ে উঠলো জেগে, বিশ্ব লোকের ভাগ্য তারা,

নয়ন যুগল নবী যখন, এলেন ধরায় জাগলো সারা।

– হযরত আব্দুল লতীফ ফুলতলী (র:)

 

সময়টা ষষ্ট শতাব্দীর শেষের দিক, গোটা আরব তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। চারিদিকে শুধু পাপাচার-অনাচার, খুন-খারাপি, কন্যাজাত শিশুকে হত্যা, দাস কেনা-বেচা, জুলুম, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন, দূর্বলদের প্রতি নির্যাতন, মুর্তিপূজা, অন্যায়-অবিচারে গোটা মরু তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেই বর্বরতা এতোটাই ঘৃন্য আর নৃশংস ছিলো যে,একে “আইয়্যামে জাহিলিয়াত/মূর্খতার যুগ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আরব সাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা এ নগরীর ক্রান্তিলগ্নে শান্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভুত হন, মানবতার প্রতীক, সৃষ্টিকূলের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী আহমাদ। আমরা যাকে হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামে চিনি। নামটা উচ্চারণের মধ্যেই আলাদা একটা আত্মিক শান্তি কাজ করে। আজ থেকে ১৪৫৬ বছর আগে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের (অধিকাংশ মতানুসারে ২৯শে এপ্রিল), আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, রবিউল আউয়াল মাসের ১২তারিখ নবী (সঃ) পৃথিবীর জমিনে তাসরিফ আনেন। বিশ্বস্ততার প্রতীক এ নবী ৪০বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্ত হন,দীর্ঘ ৬৩বছর পৃথিবীর জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে আ’লামে বারযাখে (পরকালে) পাড়ি জমান।

 

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ৫৭০খ্রিস্টাব্দে যাজিরাতুল আরবে (বর্তমান সৌদি আরবের) মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। নবী (সঃ) এর জন্মের পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ মারা যান এবং নবীর ৬বছর বয়সে তার মা বিবি আমেনা মারা যান। তার দুধ মা বিবি হালিমা তাকে লালন-পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি তার দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে লালিত-পালিত হন। ৮বছর বয়সে তার দাদা আব্দুল মুত্তালিব‌ও মারা যান। তখন নবী তাঁর বিশ্বস্ত চাচা আবু তালিবের কাছে লালিত পালিত হতে থাকেন। নবী (সঃ) নবুয়তের ১০ম বছরে তার সবশেষ বিশ্বস্ত চাচা আবু তালিব‌ও মারা যান।

 

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নসবনামা/বংশপরিচয় (মুহাম্মদ (সা:) থেকে আদনান পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ এবং নির্ভুল):

•হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

•বিন আব্দুল্লাহ

•বিন আব্দুল মুত্তালিব

•বিন হাশিম

•বিন আবদে মানাফ

•বিন কুসাই

• বিন কিলাব

• বিন মুররা

• বিন কা’আব

• বিন লুওয়াই

• বিন গালিব

• বিন ফেহের

• বিন মালেক

• বিন আন-নদর

• বিন কেনানাহ

• বিন খুজাইমা

• বিন মুদরিকা

• বিন ইলিয়াস

• বিন মুদার

• বিন নিজার

• বিন মা’দ

• বিন আদনান

আদনান থেকে হযরত ইসমাইল (আঃ) পর্যন্ত বংশধারায় অনেক পুরুষের নাম বাদ পড়েছে বলে ইবনে ইসহাক সহ অনেক ইতিহাসবিদ মত প্রদান করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর পূত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) এর বংশধর।

তথ্যসূত্র: Wikipedia

 

রাসুলুল্লাহ (সা:) এর জীবনের উল্লেখযোগ্য কতিপয় ঘটনা:-

• নবুয়ত প্রাপ্তি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম দৈনন্দিন দুনিয়ার জীবন থেকে আলাদা হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হেরা উপত্যকায় (জাবালে হেরা) ধ্যানে মগ্ন থাকেন। ৬১০খ্রিষ্টাব্দে তার প্রতি প্রথম অহি নিয়ে পৃথীবিতে হযরত জিবরাঈল (আ:) নাজিল হোন। তিনি নবীকে বলেন, “ইক্বরা’ অর্থাৎ পড়ো” হে মুহাম্মদ পড়ো! নবী (স:) উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে পারি না”, (হযরত জিবরাঈল (আ:) তখন নবীকে অনেক শক্তভাবে জড়িয়ে চেপে ধরেন) আবার বললেন, “পড়ো”, নবী উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে পারি না” (হযরত জিবরাঈল (আ:) তখন নবীকে আবার অনেক শক্তভাবে জড়িয়ে চেপে ধরেন), পুনরায় বললেন, “পড়ো”, নবী (স:) উত্তর দিলেন, “আমি পড়তে পারি না”, (হযরত জিবরাঈল (আ:) তখন নবীকে আবার অনেক শক্তভাবে জড়িয়ে চেপে ধরেন) এবং বললেন,

“পাঠ করো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।

তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, জমাট রক্ত থেকে।

পাঠ করো,

আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত,

যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন,

শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে তা, যা সে জানত না।”

-সূরা আলাক্ব (আয়াত ১-৫)

অতঃপর নবী (স:) এই অহিগুলো নিয়ে হেরা পর্বত থেকে বেরিয়ে আসেন।এ সময় তার প্রচুর জ্বর ও হাত-পা কাঁপা শুরু হয়। রাসুলুল্লাহ (সা:) এর নবুয়তী জীবনের শুরু হয়।তিনি ইসলামের প্রথম দাওয়াত তার প্রথম স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা:) কে দেন এবং বিবি খাদিজা কোনো প্রকার সংশয় ছাড়াই একত্ববাদী আল্লাহয় বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং রাসুলুল্লাহ (স:) এর সঙ্গ দেন। দীর্ঘ ৬৩ বছরে মক্কা ও মদিনায় মোট ১১৪টি সূরা নবী (স:) এর উপর নাজিল হয়। যা গোটা মানবজাতির মুক্তির পথিক হিসেবে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বহাল থাকবে।এ মহাগ্রন্থটি হলো পবিত্র আল কুর‌আন।

তথ্যসূত্র: সহীহ আল বোখারী।

 

•মিরাজে গমন:

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মেরাজের নির্দিষ্ট বছর নিয়ে মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অনেকের মতে এটি রজবের ২৭তারিখে যা হিজরতের ২-৩ বছর আগে সংঘটিত হয়েছিলো। এ সফরে নবী (স:) বোরাক নামক বাহনে করে কাবা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এ গমন করেন এবং সেখানে আম্বিয়ায়ে কেরামদের সাথে জামাতে ইমামতি করেন এবং পরবর্তীতে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে সপ্তম আসমান পরিভ্রমন করেন। এ সময় নবী (স:) পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামদের সাথে সাক্ষাৎ করেন, তাকে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করানো হয়। অতঃপর সিদরাতুল মুনতাহা তে এসে জিবরাইল আ: থেমে যান, রাসুলুল্লাহ (সা:) আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে আরশে গমন করেন এবং ফেরার পথে উম্মতের জন্য ৫০ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে আসেন। এ ব্যাপারে সহীহ বোখারীর বর্ননামতে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ওপর ৫০ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করলেন। তা নিয়ে আমি ফিরে আসার পথে মূসা (আ.)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ আপনার উম্মতের ওপর কী ফরজ করেছেন?’ আমি বললাম, ‘৫০ ওয়াক্ত সালাত।’ তিনি বললেন, ‘আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান; কারণ আপনার উম্মত তা পালন করতে পারবে না।’ আমি ফিরে গেলাম, আল্লাহ কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি আবার মূসা (আ.)-এর কাছে ফিরে এসে বললাম, ‘কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন।’ তিনি বললেন, ‘আপনি আবার আপনার রবের কাছে যান; কারণ আপনার উম্মত এটাও সহ্য করতে পারবে না।’ আমি আবার ফিরে গেলাম, তখন আল্লাহ বললেন, ‘এগুলো (সংখ্যায়) পাঁচ, কিন্তু (সওয়াবের দিক থেকে) ৫০। আমার কথা রদবদল হয় না।’ এরপর আমি মূসা (আ.)-এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি আবারও বললেন, ‘আপনার রবের কাছে ফিরে যান।’ আমি বললাম, ‘আমার রবের কাছে (পুনরায় চাইতে) আমি লজ্জা বোধ করছি।'”

 

• হিজরত ও বিদায়ী হজ:

চাচা আবু তালেব এর মৃত্যুর পর নবীর নবুয়তী দাওয়াত এর দরুন তিনি মক্কার কাফের জন্য নিকট শত্রুতার পাত্রে পরিণত হন। ফলে একটা সময় নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এবং তার বংশধরদের মক্কা থেকে বিতাড়িত করে দেয়া হয়। খাদ্য ও ক্ষুধায জ্বালায় মরুতে যাযাবর জীবন যাপন করছিলেন মহানবী ও তার অনুসারীগন। নিরুপায় হয়ে নবী যখন তায়েফে গমন করেন তখন তায়েব বাসিরা তাকে রক্তাক্ত করে। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা:) মক্কায় আর নিরাপদ রইলেন না তখন তিনি তার সফর সঙ্গীদের নিয়ে মদিনা অভিমুখে হিজরত করেন। এ হিজরতের পর থেকে আরবি বর্ষ গণনা শুরু হয়। পরবর্তীতে মদিনা থেকে তিনি তার দাওয়াতি কার্যক্রমের প্রসার ঘটান। এ সময়কালে ঘটে যায় বদরের যুদ্ধ, ওহুদের যুদ্ধ, কাফেরদের সাথে সন্ধি সহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নবী ও সাহাবিগনের ইসলাম প্রচার যখন চারিদিকে আলোড়ন সৃষ্টি করতে থাকে তখন মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম কবুল করে, মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। হিজরতের ৮ম সালে নবী (স:) মক্কা বিজয় করেন এবং যারা তাদের সাথে শত্রুতা ও ক্ষতি করেছিলো তাদের ক্ষমা করে দেন। ১০ম হিজরীতে নবী (স:) তার জীবনের শেষ হজ্ব আদায় করেন, যাকে “বিদায়ী হজ” বলা হয়। এর পরের বছর ১১হিজরীতে নবী (স:) আ’লামে বারযাখে পারি জমান।

 

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম ছিলেন সত্যবাদী তাইতো সবাই তাকে “আল আমিন” বলে ডাকত। মরুর বুকে মেষ চড়ানো বালক থেকে আল্লাহর বন্ধু, রাসুল ও আম্বিয়ায়ে কেরামদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহান নবী তার ৬৩ বছরের নবুয়তী জীবনে উম্মতের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। উম্মতের সকলের জন্য জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা নিয়ে তবেই নবী আল্লাহর কাছ থেকে সিজদাবনত হ‌ওয়া থেকে উঠেছেন। আমাদের জন্য নবীর আত্মত্যাগের প্রতিদান আমরা কোনোদিন‌ই পূরণ করতে পারবো না। মহান এই নবীর উপর লাখো লাখো দুরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক।

লেখক: সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।