শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

জলবায়ুর ন্যায়বিচার: ধনীর নিঃসরণ, দরিদ্রের নিঃশেষ

Author

সাবিহা তারান্নুম মিম , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১০ বার

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোন বিশেষ সীমানায় আবদ্ধ নয় বরং তা পরিণত হয়েছে একটি বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রশ্নে। এটি শুধু কোনো পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি ও মানবাধিকারের প্রতি তৈরি এক গুরুত্বপূর্ণ সংকট। উন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের উচ্চমাত্রার কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীর জলবায়ুকে সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অথচ তার মূল্য দিতে হচ্ছে বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। ঐতিহাসিকভাবে কার্বন নিঃসরণের প্রধান নিয়ামকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার। ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রভাবে তৈরি হয়েছে বিশ্বে Climate Finance Gap। জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত প্রতিঘাত মোকাবেলায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও বাস্তব প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান, এটি Climate Finance Gap হিসেবে আলোচিত। যে দেশগুলো সবচেয়ে কম নিঃসরণের জন্য দায়ী, তারাই দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী। অনুন্নত দেশে জলবায়ু দুর্ভোগের ফলে দরিদ্ররা ক্ষতির বোঝায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান থেকে উঠে এসেছে, পৃথিবীর দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসরণ করে কিন্তু ক্ষতির বড় অংশ গ্রহণ করছে তারাই। জলবায়ু পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ একটি উন্নয়নশীল দেশে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০০০-২০১৯ সালের মধ্যে প্রায় ১৮৫টি চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ নথিভুক্ত হয়েছে। ধনী দেশগুলোর উন্নয়নের সফল ভোগের বিপরীতে পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য বহন করতে হয় তখন উঠে আসে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। পৃথিবীর তাপমাত্রা অধিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, কার্বন উৎপাদন ও দূষণের পরিমাণ ভয়াবহ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তার লাগাম টেনে ধরতে না পারলে পৃথিবী আগামীতে বসবাস অযোগ্য হয়ে পড়বে। বিলুপ্ত হয়ে যাবে অনেক প্রাণী। বিপন্ন মানবজীবনে এ সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে। ইতিহাসের বিভিন্ন সভ্যতার ধ্বংস হওয়ার নেপথ্যে ছিল ভয়ঙ্কর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভূপ্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তনের ফলে হরপ্পা সভ্যতা, সিন্ধু অঞ্চল, মায়া সভ্যতা প্রভৃতির বিনাশ ঘটেছিল। যেখানে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বৈশ্বিক নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান প্রায় ০.৪ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে ভয়াবহ ভুক্তভোগী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদান। দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে ক্রমেই উদ্বাস্তু হচ্ছে হাওর, পাহাড়, উপকূল ও সমতলের মানুষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর অভিযোজন সক্ষমতা অপর্যাপ্ত হওয়ায় নিষ্পেষিত হচ্ছেন দেশের উপকূলের কৃষক জেলে কিংবা বাস্তুহারা পরিবার। বাংলাদেশে প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, নদীভাঙ্গন, তাপপ্রবাহের ফলে বিপুল পরিমাণ কৃষি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী উঠে আসে, জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক  দুর্যোগে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ। দুর্যোগ কবলিত পরিবারগুলো নিজস্ব অর্থায়নে মোকাবেলা করার চেষ্টা করে থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিবর্তে তাদের নিজেদের ব্যয়ে  পুনর্বাসন খরচ বহন করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অভিযোজনের সক্ষমতার সীমা যখন অতিক্রম করে যে ক্ষতি ও লোকসান ঘটে, তখন আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় উঠে আসে Loss and Damage হিসেবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা পেতে কিংবা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বাঁধ নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, লবণাক্ত সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে এই অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচি দেশের মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জীবিকা, বসতি ইত্যাদি স্থায়ীভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে দেশের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান। ২০২২ সালে COP 27 এ Loss and Damage Fund তৈরির বিষয়ে ঐক্যমত তৈরি হয় এবং ২০২৩ সালে কাঠামো করা হয়। এই অর্থায়নের পূর্ণ প্রয়োগের মাধ্যমে যে ক্ষতি ও অভিযোজনের দ্বারাও ঠেকানো, সম্ভব নয় তা নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হলেও সম্ভব করা যেতে পারে। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাসের জন্য সকল প্রয়োজনীয় টেকসই কার্যক্রম প্রসারে মনোযোগী হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত পরিচালনায় সকল কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিক সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ঘাটতির ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের মত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থা যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। দেশের বার্ষিক বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জলবায়ু সম্পর্কিত কার্যক্রমে বরাদ্দ করতে হবে। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ফলে তহবিল থেকে আর্থিক ব্যবস্থা বার্ষিক বাজেটের ওপর নির্ভরশীলতা কমাবে। জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীল কৃষি সম্প্রসারণ সমন্বিত করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নিশ্চিতকরণ জরুরী। যা দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে। যদিও জলবায়ুর বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তবু ক্ষীণ সম্ভাবনার আলোর দেখা দিতে পারে সফল পরিকল্পনা ও কার্যকরী বাস্তবায়ন। যথার্থ নীতির প্রণয়ন, অর্থায়নের সর্বোচ্চ ব্যবস্থা ও কার্যকরী উদ্যোগ টেকসই করবে দেশের সার্বিক উন্নতি। সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী করতে প্রয়োজন জীবাশ্ম জ্বালানির  ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা করা। আগামীর বিশ্বকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাসযোগ্য রেখে যেতে, ধনী দেশগুলো নীরব অবস্থান কাটিয়ে উঠতে হবে। আমাদের একমাত্র পৃথিবীতে আগামী দিনের নির্গমনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য কমানোর লক্ষ্যে প্রযুক্তি ও নীতিগত বিকল্প প্রতিষ্ঠা করবে জলবায়ু ন্যায়বিচার। বিনির্মাণ করবে সবুজ ও সমৃদ্ধির উন্নয়নের পথ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইতিবাচক পদক্ষেপ গড়ে তুলবে মানবসভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই ভবিষ্যত।

সাবিহা তারান্নুম মিম

সমাজকর্ম বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

লেখক: প্রচার সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।