চীনা বর্জ্য বিদ্যুৎ চুক্তি: জাতীয় স্বনির্ভরতা নাকি একপাক্ষিক আর্থিক বোঝা?
সম্প্রতি চায়না ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি হয়েছে। কোম্পানিটি ময়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। উদ্যেগটি দেরিতে হলেও এমন প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী চুক্তি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ স্বরুপ। বৈশ্বিক অস্থিতিশীল অবস্থার কারনে বিশ্ব জালানির বাজার আজ চরম দুর্দশার মুখোমুখি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ তো বটেই, উচ্চআয়ের দেশগুলো পর্যন্ত জালানি ক্রাইসিসে ভুগছে।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আন্তর্জাতিক শক্তি গবেষণা সংস্থা (IEEFA) এর মতে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬৫% বহিরাগত জালানি উপর নির্ভরশীল। এমন এক প্রেক্ষাপটে যদি বিদ্যুৎ-এর ক্ষুদ্র একটা অংশও দেশীয় স্বনির্ভর কায়দায় উৎপন্ন করা যায়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি পরনির্ভরশীলতা থেকেও বাংলাদেশ কিছুটা মুক্তি পাবে।
কিন্তু, ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়ন ও দেশীয় স্বার্থের বিচারে এ চুক্তির কতিপয় শর্ত অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। ২৫ বছর সময়সীমার এ চুক্তিকে আদতে যুগোপযোগী মনে হলেও কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর এটি দেশের অর্থনীতির কাধে বিষ ফোড়ার মতো ব্যথা হয়ে দাড়াবে। প্রথমত, চুক্তিটির শর্তানুযায়ী ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ টাকা। তবে, বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। যদিও বর্তমানে এর মূল্য ২৫ টাকা, কিন্তু ডলারের রেট বাড়ার সাথেসাথে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দামও বাড়বে তাল মিলিয়ে। অর্থাৎ, বর্তমান ১১৮-১২০ টাকা ডলার রেটে যে বিদ্যুৎ ২৫ টাকা ইউনিট, বছরখানেক পরে ডলারের বিপরিতে টাকার মান কমে গেলে বিদ্যুৎ ইউনিট প্রতি ৫০-৬০ টাকায় গিয়ে দাড়াবে। তাহলে, যে চুক্তির উদ্দেশ্যই ছিলো স্বল্প ও সুলভ মূল্যে স্বনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈশ্বিক জালানি বাজারের প্রভাব থেকে মুক্তিলাভ, বছর গড়ালেই এ চুক্তির অভ্যন্তরীন দূর্বলতা দেশের বিদ্যুৎ খাতকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে।
এছাড়াও, চুক্তির শর্তানুযায়ী DNCC প্রতিদিন ৩,০০০ টন ময়লা সাপ্লাই দিবে। ৩,০০০ টনের নিচে সাপ্লাই করলে টন প্রতি গুনতে হবে ৫০ ডলার। যা বিদ্যুতের দাম বাড়াবে বৈ কমাবে না। DNCC-এর ময়লা ব্যবস্থাপনার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ২০৩২ সালে ময়লা ব্যবস্থাপনার খাতভিত্তিক যেই পরিমাণ ধরা হয়েছে, তাতে আমিনবাজার প্রজেক্টে দৈনিক ৩ হাজার টন ময়লা সাপ্লাই করার মতো সক্ষমতা DNCC এর কাছে থাকবে না৷ ফলে ২০৩২ সাল থেকেই পেনাল্টি হিসেবে বাংলাদেশকে গুনতে হবে মোটা অংকের জরিমানা ৷ অন্যদিকে, চীনা কোম্পানি যদি কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যর্থ হয় বা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, তবে তাদের বিরুদ্ধে অনুরূপ কোনো সমপরিমাণ কঠোর শাস্তিমূলক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। অন্যদিকে, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার চুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রযুক্তিক ও পরিচালনাগত ঝুঁকি বিদেশি ডেভেলপার কোম্পানিকেই বহন করতে হয়।
চীনের সাথে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ারও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিবেচনায় তারা অনেক স্বল্প ও সুলভ মূল্যে বিদ্যুৎ গ্রহন করে আসছে। যেখানে, বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য খরচ করছে ২৫ টাকা, বিপরিতে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া যথাক্রমে ১১.৮৬, ২২.৭৬ ও ২৩.৬০ টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ পাচ্ছে। অর্থাৎ, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ চড়ামূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় করছে। এছাড়া, যেখানে সাধারণ বেসরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে বিপিডিবি-র ইউনিট প্রতি ১৪.৪৫ টাকা খরচ হয়, সেখানে চীনা বর্জ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিপিডিবি-কে ইউনিট প্রতি দিতে হচ্ছে ২৫.৭০ টাকা । এটি সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ভিয়েতনামের বর্জ্য বিদ্যুতের দরের (১১.৮৬ টাকা) চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি ব্যয়বহুল।
আবার, বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ মাশুলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের রয়েছে একপাক্ষিক চুক্তি। কোম্পানিগুলোর সাথে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের রয়েছে দ্বি-মুখী চুক্তি। প্রকল্প কোম্পানিগুলো জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ বিক্রি করে তুলনামূলক কম দরে। আবার স্থানীয় পৌরসভা বর্জ্য নিষ্কাশনশ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য কোম্পানিগুলোকে প্রতি টনে ২০ থেকে ৩৫ মার্কিন ডলার টিপিং ফি বা মাশুল প্রদান করে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশে কোনো দ্বি-মুখী ব্যবস্থা রাখা হয়নি, অর্থাৎ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কোম্পানিকে বর্জ্য অপসারণের জন্য কোনো টিপিং ফি বা মাশুল দেয় না। উল্টো বিনামূল্যে প্রতিদিন ৩,০০০ টন ময়লা সাপ্লাই করবে৷ আবার, সাপ্লাই নির্দিষ্ট পরিমাণ এর কম হলে টন প্রতি ৫০ ডলার করে পেনাল্টি বা জরিমানা দিতে হবে৷
সিটি করপোরেশন বর্জ্য অপসারণ ফি না দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি তাদের পুরো লাভ ও খরচের টাকাটি এককভাবে জাতীয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে আদায় করছে। যার কারণে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ইউনিট প্রতি অস্বাভাবিক বেশি, যা প্রায় ০.২১৭৮ মার্কিন ডলার (বা ২৫ থেকে ২৬ টাকা)। ফলে সিটি কর্পোরেশনের বেঁচে যাওয়া খরচের পুরো বোঝাটি গিয়ে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর। এতে দেশের সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহক ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওপর বড় আর্থিক চাপ পড়ে যাচ্ছে।
এ থেকেই অনুমেয় যে, চুক্তিটি মুলত একপাক্ষিক স্বার্থ হাসিলের জন্য হয়েছে। দেশের স্বার্থরক্ষা ও চুক্তির সমতা বাস্তবায়নে এ বৈষম্যমুলক শর্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিৎ। এ সকল সমস্যার সমাধানকল্পে সরকারকে নিতে হবে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ। সরকারি চুক্তি পুনঃমূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের আঞ্চলিক মানদণ্ড পর্যালোচনা করে বিদ্যুতের ক্রয় দর পুনঃনির্ধারণ করা উচিত। সরবরাহ ঘাটতির ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের ওপর চাপানো জরিমানার শর্ত শিথিলের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও যান্ত্রিক ত্রুটির পূর্ণ দায় চীনা কোম্পানিকে নিতে হবে। এছাড়াও, ভবিষ্যতে দেশ ও জনগনের স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের একপাক্ষিক চুক্তি থেকে মুক্তির লক্ষে বিশেষ আইনের মাধ্যমে সরাসরি চুক্তি বন্ধ করে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান এখন সময়ের দাবি ।
