ব্লু ইকোনমির অপার সম্ভাবনা হাতিয়া দ্বীপ
নদী ও সমুদ্রের মিলনভূমি হাতিয়া দ্বীপ প্রকৃতির হাতে আঁকা সম্ভাবনার এক মানচিত্র। অথচ সেই মানচিত্রে ছড়িয়ে থাকা সম্পদকে টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করার কাজ এখনো অনেক বাকি। বঙ্গোপসাগর-মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত ২,১০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি আয়তনের এই দ্বীপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে দ্বীপটির মানুষকে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার সংগ্রাম চালাতে হচ্ছে। হাতিয়ার উত্তরাঞ্চলে ভূমিক্ষয় ঘটলেও দক্ষিণে রয়েছে উর্বর চরাঞ্চল এবং সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র। এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য উপকূলীয় জীবন যাত্রাকে করেছে বৈচিত্র্যময়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের ৬৩ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি, গবাদিপশু পালন, মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। তাই দূরবর্তী দুর্যোগপ্রবণ দ্বীপ হিসেবে হাতিয়াকে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপকূলীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রাকৃতিক সম্ভাবনা রয়েছে দ্বীপটির। বারবার নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে সমুদ্র সম্পদের সমন্বিত টেকসই ব্যবহার অপরিহার্য।
সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সমন্বিত ধারণাই হলো সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি। সমুদ্র সম্পদের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের জাতীয় রূপকল্প-২০৪১, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় সুনীল অর্থনীতিকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্লু ইকোনমি সেলসহ বিভিন্ন জাতীয় সংস্থা ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে সামুদ্রিক অর্থনীতির অবদান প্রায় ৩ শতাংশ হলেও সুপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে তা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রচলিত মৎস্য আহরণের গণ্ডি পেরিয়ে সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণে জলবায়ু-সহনশীল উপকূলীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে হাতিয়া জাতীয় সুনীল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। এ দ্বীপে প্রথাগত সম্পদের অপরিকল্পিত আহরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে সেগুলোর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে। সম্পদ আহরণের পরিমাণনির্ভর প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে গুণগত মানোন্নয়ন ও মূল্য সংযোজন ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় প্রোটিনের চাহিদা পূরণে মৎস্য খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৬০ শতাংশ এ খাত থেকে সরবরাহ করা হয়। মেঘনা নদীর মোহনা ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হাতিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল মৎস্য সম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত ইলিশ উৎপাদনে হাতিয়াসংলগ্ন অভয়াশ্রমগুলোর অবদান অসামান্য। এছাড়া রূপচাঁদা, ভেটকি, পোয়া, ছুরিমাছ, চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এ অঞ্চলে পাওয়া যায়। তবে অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ রোধ এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রের মাছের প্রকৃত জৈবভর নিরূপণসহ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা জরুরি। এসব গবেষণার ভিত্তিতে মাছের সর্বোচ্চ টেকসই আহরণমাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। আহরণোত্তর অপচয় রোধে নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার কিংবা বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আদলে হাতিয়ার উপকূলে আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন। সুসংগঠিত হিমায়িত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় জেলেদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্য পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে সুনীল অর্থনীতির বিকাশে পরিবেশবান্ধব সামুদ্রিক চাষ বা মেরিকালচারের প্রসার হাতিয়ার জন্য সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হতে পারে। বিশেষ করে লো-ট্রফিক এক্সট্র্যাক্টিভ মেরিকালচার পদ্ধতিতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে সামুদ্রিক প্রজাতির চাষ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাভজনক উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাতিয়ার অগভীর উপকূলীয় এলাকা ও পলিযুক্ত চরাঞ্চলে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে সামুদ্রিক কাঁকড়া, সবুজ ঝিনুক চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষও হাতিয়ার অর্থনৈতিক চিত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। উলভা, গ্রাসিলারিয়া এবং হাইপনিয়া প্রজাতির শৈবাল উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ায় দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খাদ্য, ওষুধ ও প্রসাধনশিল্পে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। হাতিয়ার উপযোগী জলাশয়ে পরিকল্পিতভাবে শৈবাল চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সামুদ্রিক কার্বন শোষণে শৈবালের ভূমিকা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনেও সহায়তা করতে পারে।
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এছাড়া ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে ২২ দিনের প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এসব নিষেধাজ্ঞার সময় আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলে পরিবারগুলো আর্থ-সামাজিক সংকটে পড়ে, বাড়ে ঋণগ্রস্ততা। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ভিজিএফের চাল-সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও পরিবারগুলোর সার্বিক চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়। এ পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণায় দেখা যায়, গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি লালন-পালন, কুটিরশিল্প ও সবজি চাষের মতো কর্মকাণ্ডে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা জেলে পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে। হাতিয়ায় জেলেদের সম্পৃক্ত করে বিকল্প জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে মৎস্যসম্পদ সুরক্ষায় প্রণীত আইনগুলোর প্রতিপালনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ কাঁচা অবস্থায় বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করা হাতিয়ার সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত। ঐতিহ্যগতভাবে হাতিয়ায় আহরিত সামুদ্রিক মাছের সিংহভাগই অপরিশোধিত কাঁচামাল হিসেবে নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার কিংবা উপকূলীয় ঘাটে প্রাথমিকভাবে বিক্রি হয়। পরে এসব মাছ চট্টগ্রামসহ ঢাকার পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্য সম্পদ ভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠেনি, বিকশিত হয়নি প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। এতে একদিকে আহরণোত্তর অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিপুল বাণিজ্যিক আয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় অর্থনীতি সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ মৎস্য অবতরণকেন্দ্র এবং পরীক্ষাগার স্থাপন করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে রেডি-টু-কুক মাছ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি, চিংড়ি-কাঁকড়ার ক্যানজাত পণ্য, ফিশ ফিলেট, ফিশ অয়েলসহ বিভিন্ন হিমায়িত-প্রক্রিয়াজাত সামগ্রী উৎপাদন সহজতর হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অপরিশোধিত কাঁচামাল বিক্রির তুলনায় মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানিমূল্য দুই থেকে তিন গুণ বেশি হয়। এ ধরনের মূল্য সংযোজন স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে বৈদেশিক বাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিং কারখানা গড়ে তোলা গেলে উপকূলীয় নারী ও শিক্ষিত তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে উপকূলীয় দারিদ্র্য বিমোচনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব সৌরশক্তিচালিত শুকানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসম্মত শুঁটকি উৎপাদনে নারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ঘটবে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি ও গুণগত মান বজায় রেখে শুঁটকি উৎপাদন করা সম্ভব হলে বিদেশের বাজারে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনাও উন্মোচিত হবে। সুনীল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো পরিবেশবান্ধব উপকূলীয় পর্যটন বা ইকোট্যুরিজম। এ ক্ষেত্রে হাতিয়ার সর্বদক্ষিণে অবস্থিত নিঝুম দ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এ দ্বীপের প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, চিত্রা হরিণ, শীতকালীন পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য এবং দীর্ঘ নির্জন বালুকাবেলা একে দক্ষিণ এশিয়ার জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ পর্যটন গন্তব্য গুলোর মধ্যে স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছে। সুনীল অর্থনীতির নীতির আলোকে নিঝুম দ্বীপে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক ইকোট্যুরিজমের প্রসার ঘটানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড, ডিঙি নৌকার চালক, হস্তশিল্প নির্মাতা, পরিবেশবান্ধব হোমস্টে ও ইকো-কটেজ পরিচালনায় যুক্ত তরুণদের জন্য টেকসই আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পর্যটনের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে নিরূপণ করে পর্যটকের সংখ্যা এবং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অপরিকল্পিতভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা, প্লাস্টিক দূষণ, মোটরচালিত যানবাহনের বিকট শব্দ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত করে সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকদের জন্য প্রণীত পরিবেশগত নির্দেশিকাও কঠোরভাবে কার্যকর করা জরুরি। প্রাকৃতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে পরিবেশবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে নিঝুম দ্বীপের অনন্য জীববৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত থাকবে। হাতিয়ার বিস্তীর্ণ উর্বর চরাঞ্চলে গবাদিপশু পালন ও সমন্বিত জলজ চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় দ্বীপটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। এসব চর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে; সম্প্রসারিত হতে পারে কৃষিজমির পরিমাণ। তবে সামুদ্রিক লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের কারণে সেচের সুপেয় পানির সংকট হাতিয়ার কৃষি উৎপাদনশীলতাকে বারবার ব্যাহত করছে। এ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জলবায়ু-সহনশীল কৃষিপদ্ধতির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণ। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল লবণসহিষ্ণু ধানের জাত, যেমন ব্রি ধান-৬৭ ও ব্রি ধান-৯৭, ভাসমান বেডে সবজি চাষ, গ্রীষ্মকালীন তরমুজ উৎপাদন, সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক চারণভূমি ভেড়া-মহিষ পালনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দুগ্ধজাত পণ্যের বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আধুনিক কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে। এছাড়া নিম্ন চরাঞ্চলের যেসব এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রভাব তুলনামূলক কম, সেখানে ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাঁস পালন এবং পরিবেশবান্ধব খাঁচায় মাছ চাষের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা গেলে ভূমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করে স্থানীয় কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সামুদ্রিক টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্লু বন্ড এবং জলবায়ু অর্থায়নের মতো উদ্ভাবনী অর্থায়ন কৌশল বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। হাতিয়ার সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), সময়োপযোগী অবকাঠামো উন্নয়নে স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অপরিহার্য। স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে সামুদ্রিক সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে হাতিয়ার সামুদ্রিক অর্থনীতি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে পরিকল্পিতভাবে সুনীল অর্থনীতির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে হাতিয়া জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। দ্বীপটির কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।
হাতিয়ার সামুদ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে প্রাকৃতিক ঝুঁকি প্রশমন ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মেঘনা নদীর মোহনায় গতিশীল বদ্বীপীয় প্রক্রিয়ার সম্মুখভাগে অবস্থিত হওয়ায় দ্বীপটি নিয়মিত নদীভাঙন, বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়, তীব্র জলোচ্ছ্বাসের ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তর হাতিয়ার ১২ কিলোমিটারের বেশি উপকূলীয় ভূখণ্ড নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততার ব্যাপক অনুপ্রবেশ সুপেয় পানির সংকট তীব্র করছে। পানির গড় লবণাক্ততা ৯.২৬ পিপিটি পর্যন্ত পৌঁছানোর ফলে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে এবং সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রথাগত মাটির বাঁধের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উপকূল সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পোল্ডার পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নদীর গতিপথ ও প্রবাহের ধরন হাইড্রোলজিক্যাল সমীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দীর্ঘস্থায়ী নদীশাসন, সিসি ব্লক স্থাপন এবং প্রয়োজনভিত্তিক ক্যাপিটাল ড্রেজিং বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কুতুবদিয়া দ্বীপে পরীক্ষিত বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার কৌশল অনুসরণ করে উপকূলে গোলপাতা, কেওড়া, বাইনগাছের সমন্বয়ে ঘন সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ ধরনের ম্যানগ্রোভ বনায়ন জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে, পলি সঞ্চয়ে সহায়তা করতে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা জোরদার করতে পারে। এছাড়া দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার, জলবায়ু-সহনশীল স্লুইসগেট নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অভ্যন্তরীণ নিষ্কাশন ব্যবস্থার নিয়মিত সংস্কার হাতিয়ার ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য। সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দ্বীপটির জনবসতি, কৃষি, জীববৈচিত্র্য সামুদ্রিক অর্থনীতির ভিত্তি আরও সুরক্ষিত হবে।
সামুদ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুফল টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে আধুনিক নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিরাপদ ও নিয়মিত নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করা। মূল ভূখণ্ড থেকে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে হাতিয়ার বাসিন্দাদের যাতায়াত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের ট্রলারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে হাতিয়া চ্যানেলে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের নাব্যতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে নামার বাজার, তমরদ্দি কিংবা জাহাজমারা ঘাটে সারা বছর ব্যবহার উপযোগী আধুনিক পন্টুন, জেটি, যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে। নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নৌযোগাযোগ আরও নিরাপদ করতে ডিজিটাল রিভার ইনফরমেশন সিস্টেম চালু এবং রাতে নৌযান চলাচলের জন্য আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা স্থাপন করা প্রয়োজন। সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পরিচালনার জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় সৌরবিদ্যুৎ, অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়ে হাইব্রিড বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে মাছ আহরণ-পরবর্তী সংরক্ষণ, হিমায়িতকরণ শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। এছাড়া ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে উৎপাদকেরা সরাসরি আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, বাজারদর সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাবেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন সুবিধা (আইপিএফএফ) কাজে লাগিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে হাতিয়ার নৌ-যোগাযোগ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে।
সামুদ্রিক অর্থনীতির অবকাঠামোগত রূপান্তর ও সম্পদ আহরণের সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং স্থানীয় নারী-তরুণদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। হাতিয়ার প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের একটি বড় অংশ নারী-কর্মক্ষম তরুণ। উপযুক্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাবে তাঁদের অনেকেই স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারছেন না। বিশ্বব্যাংক ও ওয়ার্ল্ডফিশের সহায়তায় পরিচালিত ইকোফিশ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, উপকূলীয় নারীদের উইমেন ইনকাম অ্যান্ড নিউট্রিশন গ্রুপ (উইং) কিংবা স্থানীয় ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংঘের আওতায় সংগঠিত করা তাঁদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উপায় হতে পারে। মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত সৌর ড্রায়ারে উন্নত মানের শুঁটকি তৈরি, পুষ্টিকর ফিশ পাউডার উৎপাদন, শৈবালজাত পণ্য তৈরির আধুনিক কৌশল বিষয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ নারীদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করবে। এছাড়া স্থানীয় প্রাকৃতিক কাঁচামালনির্ভর পরিবেশবান্ধব হস্তশিল্প তৈরি, নার্সারি গড়ে তোলা, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি পালন এবং উৎপাদিত পণ্যের ডিজিটাল বিপণন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নারীদের জন্য স্থায়ী আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। নতুন উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল লেনদেন ও ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করা গেলে তাঁদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের সামুদ্রিক লজিস্টিকস, নৌপরিবহন, শিপিং, নেভিগেশন খাতে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ ধরনের সমন্বিত অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিকাঠামো বাস্তবায়িত হলে হাতিয়ার সামুদ্রিক অর্থনীতি জাতীয় জিডিপিতে অবদান রাখার পাশাপাশি সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা ও জলবায়ু-সহনশীল স্থানীয় উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।
হাতিয়ার সামুদ্রিক অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ দূর করা জরুরি। বর্তমানে খাতভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ প্রায় ২০টি সরকারি সংস্থা নিজ নিজ ক্ষেত্রে পৃথকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। ফলে সমন্বিত সুনীল অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামুদ্রিক সম্পদ বিষয়ক বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি, অনিয়ন্ত্রিত অবৈধ মৎস্য আহরণ, উপকূলীয় প্লাস্টিক দূষণ, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সীমিত অংশগ্রহণ টেকসই সামুদ্রিক উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায়। টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় জলবায়ু-সহনশীল উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে হাতিয়া, ভোলা, নিঝুম দ্বীপসংলগ্ন মেঘনা মোহনায় সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রয়োগের বিষয়ে গবেষণা ভিত্তিক দিকনির্দেশনা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১৪-এর লক্ষ্য অর্জনে সমুদ্র উপকূলীয় জলসীমাকে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণ এলাকা, পরিবেশবান্ধব মেরিকালচার অঞ্চল, সংরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা, নিরাপদ নৌপরিবহন চ্যানেলে নির্ধারিত ইকোট্যুরিজম অঞ্চলে ভাগ করে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা নীতি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণে এ ধরনের স্থানিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সংঘাত কমানো সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে হাতিয়ার সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
সামুদ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সময়োপযোগী নীতি বাস্তবায়নের জন্য তিন ধাপের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, স্বল্পমেয়াদি পর্যায়ে (১-২ বছর) বঙ্গোপসাগর-মেঘনা মোহনায় মাছের মজুত জরিপ, বায়োমাস নিরূপণ, ব্লু ইকোনমি স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (বিবিইএসএ) চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে মৎস্যজীবী নিবন্ধন কার্ড ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করে মাছ আহরণ-পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণে নিয়োজিত নারীসহ প্রকৃত শ্রমজীবীদের তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার পাশাপাশি জেলে পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করাও এ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দ্বিতীয়ত, মধ্যমেয়াদি পর্যায়ে (৩-৫ বছর) হাতিয়ার উপকূলে সৌরবিদ্যুৎচালিত সমন্বিত কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা, আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ এবং নিঝুম দ্বীপে পরিবেশের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রেখে কমিউনিটি ভিত্তিক ইকোট্যুরিজম সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। এ সময় পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে সামুদ্রিক কাঁকড়া, শৈবাল চাষের পরিধি বাড়ানো ও ইকোসিস্টেম নির্ভর মৎস্য ব্যবস্থাপনা (ইএএফএম) জোরদার করতে হবে। স্থানীয় নারী সংগঠনের মাধ্যমে পুষ্টিকর ফিশ পাউডার, শৈবালজাত পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এছাড়া মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় জেলে পরিবারগুলোর আয় সচল রাখতে বিকল্প জীবিকা, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখা জরুরি। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে (৫ বছরের বেশি) গভীর সমুদ্রে টুনাসহ উচ্চমূল্যের মাছ আহরণের সক্ষমতা গড়ে তোলা, আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে ইলিশের আন্তসীমান্ত টেকসই ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং সামুদ্রিক শৈবাল ভিত্তিক প্রসাধনী ও ওষুধ শিল্পের বাণিজ্যিক বিকাশে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বায়ুশক্তি, জোয়ার-ভাটার শক্তি কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই, সুনীল বন্ডের মাধ্যমে টেকসই অর্থায়নের ব্যবস্থা ও সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনার সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এই তিন ধাপের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে হাতিয়াকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ ও জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের সঙ্গে উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে হাতিয়া বাংলাদেশের সমুদ্রনির্ভর প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা করে বঙ্গোপসাগরের বিপুল সম্পদের সম্ভাবনাকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের বদ্বীপভিত্তিক অর্থনীতির দিগন্ত প্রসারিত করবে। হাতিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সমুদ্র উপকূলের সম্পদ কতটা বিজ্ঞানসম্মত, ন্যায়সংগত, পরিবেশবান্ধব উপায়ে কাজে লাগানো যায় তার ওপর। সমুদ্রের সম্ভাবনাকে স্থানীয় মানুষের সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করতে পারলেই হাতিয়া বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
রাকিবুল হাসান মুন্না
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
