শিক্ষাজীবন শেষ করে একটি ভালো চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন অনেক শিক্ষার্থী। আবার কেউ কেউ চান নিজের উদ্যোগে কিছু করতে, নতুন পণ্য তৈরি করে মানুষের নানা সমস্যার সমাধান দিতে। কিন্তু ইচ্ছা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাব, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেকেই এগোতে পারেন না। অথচ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করা সম্ভব। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধারণা নিয়ে কাজ করবেন, ভুল থেকে শিখবেন এবং উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে উদ্যোক্তা তৈরিকে চাকরির বিকল্প হিসেবে দেখলে চলবে নাহ বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের একটি পথ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। একজন উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। ছোট একটি উদ্যোগও সময়ের সঙ্গে বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, অনলাইন ব্যবসা, পরিবেশবান্ধব পণ্য কিংবা শিক্ষাসহায়ক সেবা-বিভিন্ন ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু করার সুযোগ রয়েছে। তাই উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি শুধু ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে সীমাবদ্ধ না রেখে সব বিভাগের শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ধারণা থাকলেও প্রাথমিক পুঁজি না থাকায় তাঁরা এগোতে পারেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ক্ষুদ্র অনুদান, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রাথমিক বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। তবে অর্থায়নের আগে উদ্যোগের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা দরকার।
এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ধারণা অনেক সময় অপরিপক্ব থাকে, শিক্ষকেরা সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে তা বাস্তবসম্মত রূপ পায়। এ জন্য পাঠ্যক্রমে উদ্যোক্তা সহায়ক বিষয় যুক্ত করা, শিক্ষকদের মেন্টরিং প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে সহায়তাকারী শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষক যদি পথপ্রদর্শকের ভূমিকাও পালন করেন, শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে নতুন কিছু করতে আরও আত্মবিশ্বাসী হবেন। ধারণা থেকে পণ্য বা সেবায় পৌঁছাতে হাতে-কলমে কাজ করার জায়গাও দরকার। ক্যাম্পাসে ইনোভেশন ল্যাব, কো-ওয়ার্কিং স্পেস বা ইনকিউবেটর থাকলে শিক্ষার্থীরা প্রোটোটাইপ তৈরি, পরীক্ষা ও পরিমার্জনের সুযোগ পাবেন। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী একসঙ্গে কাজ করলে নতুন সহযোগিতাও তৈরি হয়, যেমন প্রযুক্তির শিক্ষার্থীর সঙ্গে বিপণনের শিক্ষার্থীর যৌথ উদ্যোগ। বড় অবকাঠামো সম্ভব না হলে পুরোনো শ্রেণিকক্ষ বা গ্রন্থাগারের একাংশে ছোট পরিসরে শুরু করা যেতে পারে।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ বাজারের চাহিদার সঙ্গে না মিললে টেকে না। তাই শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মিত যোগাযোগ জরুরি। ইন্টার্নশিপ, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মেন্টরিং এবং পণ্য যাচাইয়ের জন্য বাস্তব বাজারে প্রবেশের সুযোগ তাঁদের বাণিজ্যিক বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করবে। সফল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মেন্টর হিসেবে যুক্ত করলে নতুনরা সরাসরি অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারবেন।
সরকারি পর্যায়েও এ ধরনের সুযোগ রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীন আইডিয়া প্রকল্পের ইউনিভার্সিটি এক্টিবেশন প্রোগ্রাম-এ নির্বাচিত স্টার্ট-আপের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা প্রি-সিড অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। কর্মসূচিটিতে উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচির তথ্য শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আবেদনপ্রক্রিয়া বুঝিয়ে দেওয়া এবং উপযুক্ত প্রকল্প তৈরিতে সহায়তা করা প্রয়োজন।
নারী শিক্ষার্থী এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও জরুরি। তাঁদের জন্য বৃত্তি, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও অর্থায়নের বিশেষ সুযোগ রাখা যেতে পারে। পড়াশোনার সঙ্গে উদ্যোগ পরিচালনার সমন্বয় ঘটাতে প্রকল্পভিত্তিক কাজ, নির্দিষ্ট সময়ের প্রশিক্ষণ এবং ক্যাম্পাাসভিত্তিক কাজের সুযোগ তৈরি করা দরকার। শুরুতে ব্যর্থতা এলে সেটিকে শেখার অংশ হিসেবে দেখার মানসিকতাও গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেগুলোর মান ও স্থায়িত্বের দিকেও নজর দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সমস্যার সমাধান করছেন, তাঁদের পণ্য বা সেবা কতটা কার্যকর এবং উদ্যোগটি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে কি না-এসব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ জন্য প্রতি বছর উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সফল উদ্যোগের অভিজ্ঞতা অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, পরামর্শ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের নতুন ধারণা বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেবে। এতে একদিকে শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরতার পথ খুলবে, অন্যদিকে অর্থনীতিতে নতুন কাজের সুযোগ ও নতুন ধারণার প্রসার ঘটবে। তাই ক্যাম্পাসকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা হিসেবে নয়, দক্ষতা ও উদ্যোগ বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে। আগামী দিনের উদ্যোক্তা তৈরির কাজ শুরু হোক আজকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই।