শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় ফলাফলের প্রভাব
GPA-5 বা গোল্ডেন এ প্লাস – এ যেন এক সোনার হরিণ। পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডে এ শব্দ উল্লেখ থাকলে জীবন যুদ্ধে যেন সফলতা নিশ্চিত; আর উল্লেখ না থাকলে ভবিষ্যত সম্ভাবনা, সামাজিক সম্মান ও পারিবারিক স্নেহ – সবই যেন এক অন্ধকার কুটিরে বন্দী হয়ে যায়। এমন ঘৃণিত মনোভাবই আজ আমাদের সমাজে প্রচলিত ও সমাদৃত। ছোট্ট এক নিষ্পাপ প্রাণ অঙ্কুরোদগোমের পূর্বেই ঝরে যাচ্ছে ছোট্ট চারটি লেটারের বোঝা বইতে না পেরে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ডিজাস্টার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী ৪ ঘন্টায় সারাদেশে ৯ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে, যা পরবর্তী ৩ দিনে ১৬ জনে পৌছায়। এছাড়া, ৯-১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলো। এমন ভয়াবহ চিত্র প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষার পরবর্তী পরিচিত ঘটনা, যা দেশের স্পষ্টত সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতীক।
পরীক্ষায় এ-প্লাস বা GPA-5 পাওয়াই যেন আমাদের মেধা মূল্যায়নের একমাত্র পরিচায়ক হয়ে দাড়িয়েছে। কোন শিক্ষার্থী এর থেকে কিয়দাংশ কম পেলেই তাকে মেধাহীন, বিফল ও অন্ধকার ভবিষ্যতের অধিকারী হিসেবে চিত্রায়ণ করা হয়। যেন তার ভবিষ্যতের সকল আশা-ভরসা এর উপরেই নির্ভর করছিলো। এ অসুস্থ মনোভাবের কারণে প্রতিবছরই বেশকিছু তাজা প্রাণ হারাচ্ছি।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার দিন থেকে ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত পরীক্ষার্থীকে মুখোমুখি হতে হয় নানাবিধ প্রশ্নের। চরম বিষাদময় এক মূহুর্ত পার করে সে। যে সময়টুকু কাটানোর কথা ছিলো মানসিক প্রশান্তি ও চাঞ্চল্যকর অবকাশে, তা প্রবাহিত হয় সমাজের মনতুষ্টির কাঙ্ক্ষিত এক ফলাফলের আশায়। পুষ্পতুল্য এক নির্মল হৃদয় বিষিয়ে উঠে এর পরিক্রমায়, পরবর্তীতে অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রাপ্তিতে যা রূপ নেয় আত্মহননের বিভীষিকাময় পথে। সমাজের এ বিভৎস চিত্রের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশেই দায়ী।
“এ প্লাস”-কে সফলতার মাপকাঠি বানিয়ে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা শিক্ষার্থীকে প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তাদের কাছে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, জ্ঞানের বাস্তবিক প্রয়োগ দক্ষতা ও নৈতিক উন্নতির থেকে কাঙ্ক্ষিত ফলাফলই বড় হয়ে দাড়ায়। যখন ফলাফল মনঃপুত হয় না এবং পরিবারের নিশ্চুপ অবহেলা প্রতিয়মান হয়, শিক্ষার্থী নিজেকে ব্যর্থ সন্তানের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আত্মহননের শাস্তি বেছে নেয়।
ফলাফল প্রকাশের দিন আমাদের সমাজে এক চরম বৈষম্যমূলক আচরণ দেখা যায়। সকল বিষয়ে কৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের নিয়ে জমজমাট পরিবেশে উদযাপন করা হয়; পরিবারের সদস্যরা মিষ্টিমুখ করেন। প্রতিবেশিরা শিক্ষার্থীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেন। অন্যদিকে, “এ-প্লাস” না পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি আশাব্যাঞ্জক বাক্য উচ্চারণের জন্য শিক্ষক কিংবা অভিভাবক – কেউ উপস্থিত থাকেন না। যদিও সকল অভিভাবক ও শিক্ষক এমন নন, তবে সমাজের গড়পড়তা চিত্র এটাই।
এই কঠিন সময়ে শিক্ষার্থীদের মন থাকে খুবই স্পর্শকাতর ও দুঃখগ্রাহী। তারা সান্ত্বনার আশ্রয় খুজে; নিজের ব্যর্থতাকে কাটিয়ে নতুনভাবে ঘুরে দাড়াতে আশার বাণী শুনতে চায়। পরিবারের সদস্যদের উপর এ দায়িত্বের সিংহভাগ বর্তায়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারাই সবচেয়ে বেশি নিরাশ করে।
সান্ত্বনামূলক উপদেশের বিপরীতে তাদের শুনতে হয় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক কথাবার্তা। পাশের বাড়ির কোন ছেলে কিংবা কোন আত্মীয়ের মেয়ে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে, তাদের নিয়ে চলে উদাহরণের ফুলঝুড়ি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে কার্যকর বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। পরীক্ষা-পরবর্তী সময় সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফলাফলের প্রয়োজনীয়তা ও তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – জীবন মুল্যায়নের অনুধাবষমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিৎ। ছোট্ট একটা পেপার যে কারো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না – শিক্ষার্থীদের অন্তরে এ অনুধাবনটা জাগ্রত করা জরুরি। সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক অসহনীয় চাপ প্রয়োগ দূরীকরণে কর্মশালা আয়োজন করা যায়। এতে, ফলাফলের প্রতি অভিভাবক ও সমাজের অতিমাত্রার প্রত্যাশা নিরসনে আলোকপাত করে তার প্রশমিত করা যেতে পারে।
অবশ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগ দৃষ্টিগোচর হয় না; উল্টো দেখা যায় বিপরীত দৃশ্য। অকৃতকার্য কিংবা কিছু নাম্বার কম পাওয়া শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে কঠিন জেরার মুখোমুখি করা হয়; যেন সকল দোষ শিক্ষার্থীর। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক বাক্যশ্রবণে তারা হীনম্মন্যতায় ভুগে, আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়ে তাদের।
সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির বেশ প্রভাব রয়েছে শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিমন্ডলে। ফলাফল খারাপ হলেই তাকে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। শুনতে হয় নানা টিটকারিমূলক বাক্য। অগত্যা সে নিজেকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, প্রতিনিয়ত লিপ্ত থাকে আত্মসমালোচনায়। এ ধরনের অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার।
শিক্ষাব্যবস্থায় মেধার মূল্যায়নের মানদন্ডের অবশ্যই প্রয়োজন আছে। প্রতিযোগিতামুলক পরিবেশ না থাকলে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে তাদের প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে এ মানদন্ড। তবে লক্ষ রাখতে হবে, এ মানদন্ড যেন জীবন-মৃত্যুর কারণ না হয়ে দাড়ায়। একটি নিষ্পাপ প্রাণ যেন অকালেই ঝড়ে না পরে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ার হতাশায়। ক্লাসরুমে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়েও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিৎ। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষাবিদরা এ বিষয়ে আলাদা গুরুত্ব প্রদান করে ফলপ্রসূ একটি সমাধানে কার্যত পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিয়োগ বেদনায় ব্যথিত হবে দেশবাসী।
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
