রবিবার, ৩ মে ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

সীমান্ত যেন চোরাচালানের আধার

Author

মোঃ আরিফুল ইসলাম রাফি , জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ পাঠ: ১৯ বার

বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থল ও জলসীমান্ত অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, বিশেষ করে মিয়ানমারের সঙ্গে। এই সুবিশাল সীমান্ত রেখা শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাই নয়, বরং এখন এক বিশাল চোরাচালান ও মাদক কারবারিদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে মাদক, অস্ত্র, এবং একটি অপরাধচক্রের নেটওয়ার্ক বিস্তার লাভ করছে। দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা, সমাজ ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব দিন দিন গুরুতর হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চোরাচালান রোধে কাজ করলেও এর পরিমাণ কমছে না; বরং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে মাদক পাচার সবচেয়ে বেশি হয়। ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, এবং অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য প্রতিনিয়ত সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল থেকে ইয়াবার মূল সরবরাহ আসে, যা বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এছাড়াও সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। চোরাচালানের মাধ্যমে স্বর্ণ, রূপা, কসমেটিকস, বিদেশি পণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভারত থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও হেরোইন জব্দ করছে। নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত হাজার হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট দেশে প্রবেশ করছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৯০–১০০ টাকা। এই মাদক সহজলভ্য হওয়ায় দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমানে ফেন্সিং ও মনিটরিং (ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা) শুরু হয়েছে কিছু এলাকায়। মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে র‍্যাব ও পুলিশ। কিন্তু সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় চোরাকারবারিরা এখনও সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সমস্যাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

চোরাচালান একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও এই সমস্যা মোকাবিলা করা জরুরি।

মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইয়াবা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চোরাচালানকারীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

চোরাচালান শুধু অর্থনীতির ক্ষতি করছে না; এটি দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। সীমান্ত রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!