জলবায়ু শরণার্থী ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ

‘বাংলাদেশ’ এই শব্দটার মধ্যেই যেন মাটি, পানি, গন্ধ, নদী আর মানুষের প্রাণ মিশে আছে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস মানেই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস। কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো বন্যা, কখনো নদীভাঙন; তবু মানুষ টিকে থেকেছে। কারণ সে জানে, এই মাটিই তার জীবন।
কিন্তু আজ সেই মাটি, সেই নদী, সেই প্রকৃতি; সবকিছু যেন প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, বৃষ্টি অস্বাভাবিক, মাটিতে লবণ ঢুকছে, নদী খেয়ে ফেলছে গ্রাম। এই পরিবর্তনের শিকার হচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ, তাদের নতুন নাম ‘জলবায়ু শরণার্থী’।
‘শরণার্থী’ শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, রক্ত, সীমান্ত পার হওয়া মানুষ। কিন্তু জলবায়ু শরণার্থীরা কোনো যুদ্ধের কারণে ঘর হারায়নি। তাদের শত্রু হলো অদৃশ্য জলবায়ু পরিবর্তন। এরা সেই মানুষ, যারা একদিন সকালে জেগে দেখে, নদী তাদের ঘরটাকে গ্রাস করেছে বা ফসলি জমি এক রাতেই নোনাজলে ডুবে গেছে; কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের পর তাদের গ্রামই আর মানচিত্রে নেই।
জাতিসংঘের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হবে। অর্থাৎ, প্রতি তিনজনে একজনের জীবনে আসবে একবার করে স্থানচ্যুতি বা জীবিকা হারানোর ভয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। দেশের প্রায় ৪০% কর্মসংস্থান সরাসরি কৃষিতে এবং আরও প্রায় ৩০% মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান, পাট, গম, আলু, চা; এসব শুধু ফসল নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, আত্মপরিচয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। এই কারণে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং দেশের ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারাতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ থেকে ২০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যেতে পারে। এই সময়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারানো যেতে পারে, যা খাদ্য উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। পরিবর্তনের অভিঘাতে এই কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে মারাত্মকভাবে; বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা; হাওরাঞ্চলে অকালবন্যা। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে কৃষকের ব্যয় বাড়ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) হিসাব অনুযায়ী, যদি গড় তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তাহলে ধান উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আর যদি ২ ডিগ্রি বাড়ে, তাহলে সেই ক্ষতি দ্বিগুণ হতে পারে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, এমনকি জাতীয় প্রবৃদ্ধিও এর প্রভাবে বিপর্যস্ত হবে।
একজন কৃষকের জীবন হলো প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ। কখনো বেশি বৃষ্টি, কখনো কম, কখনো ঝড়ে ফসল যায়, কখনো পোকায় খায়; সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকে সে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে কৃষক বুঝে উঠতে পারছে না, কীভাবে বাঁচবে।যখন কৃষক হারায় জমি, তখন সে শুধু জমি হারায় না; সে হারায় পরিচয়, স্বপ্ন, মর্যাদা। আর তখনই জন্ম নেয় জলবায়ু শরণার্থী।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর জমি বর্তমানে লবণাক্ত পানির প্রভাবে আক্রান্ত। শত শত খাল শুকিয়ে গেছে, নদীর পানিও মিঠা নেই। খালের পানি দিয়ে ধান চাষ করা যায় না, পশু পানি খেতে পারে না। অন্যদিকে, জোয়ার-ভাটার প্রভাবে লবণ আরও ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে।
তবু সবকিছু অন্ধকার নয়। বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা ও তরুণ উদ্যোক্তারা এখন নতুন পথ খুঁজছেন। লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান, খরাপ্রতিরোধী শস্য, উঁচু বিছানায় সবজি চাষ; এসব উদ্ভাবন ইতিমধ্যেই প্রমাণ করছে যে, আশা এখনো বেঁচে আছে।
যখন একজন কৃষক বা জেলে তার গ্রাম হারায়, তখন সে কোথায় যায়? উত্তর একটাই- শহরে। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ; এই শহরগুলো প্রতিদিন গিলে নিচ্ছে হাজার হাজার জলবায়ু শরণার্থী। তারা এখানে আসে বাঁচার আশায়, কিন্তু এখানে বাঁচাটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কঠিন কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ বস্তিতে, নোংরা ড্রেনের পাশে, একরুমে সাত-আটজন মিলে থাকে তারা। কাজ পেলে খায়, না পেলে উপোস।
একটা কথা খুব স্পষ্ট, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। বিশ্বে মোট কার্বন নির্গমনের আমাদের অংশ মাত্র ০.৪%, অথচ ক্ষতির ভাগ সবচেয়ে বেশি আমাদের কাঁধে। এটা শুধু অন্যায় নয়, এটা অনৈতিকতা। উন্নত দেশগুলো, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পায়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করেছে, তাদেরই উচিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা করা।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিশ্রুত “Loss and Damage Fund” এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতিই রয়ে গেছে। আমাদের কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো হতে হবে আন্তর্জাতিক পরিসরে, জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য আইনি স্বীকৃতি ও পুনর্বাসন নীতি চাই।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে হলে এখনই দরকার সমন্বিত নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কিছু করণীয় হতে পারে: উপকূলীয় বাঁধ ও মিঠাপানি সংরক্ষণ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো। কৃষি পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নতুন করে চাষ শুরু করতে পারে। নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু শরণার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা। পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা। গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল বাড়ানো, যাতে দেশীয় বিজ্ঞানীরা নতুন সমাধান বের করতে পারেন।
বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি জীবনবোধ। ধান কাটা, নবান্ন, বর্ষা, পিঠা, পাটের মাঠ; এসব আমাদের গান, কবিতা, উৎসবের অংশ। এই কৃষি যদি একদিন হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু অর্থনীতি নয়, হারিয়ে যাবে আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। তাই কৃষিকে বাঁচানো মানে শুধু খাদ্য বাঁচানো নয়, এটি মানে দেশের আত্মাকে বাঁচানো।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো দূরের কথা নয়। আমরা এর মধ্যেই আছি। তবু এখনো সময় আছে; যদি আমরা চাই, যদি আমরা একসঙ্গে কাজ করি। বাংলাদেশের তরুণরা আজ উদ্ভাবনী, তারা প্রযুক্তি জানে, তারা মাটি ভালোবাসে। যদি রাষ্ট্র, সমাজ, বিজ্ঞান ও ব্যবসা একসঙ্গে আসে, তাহলে আমরা প্রমাণ করতে পারব ছোট একটি দেশও বড় উদাহরণ হতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের। তখন হয়তো একদিন সেই কৃষক, যে আজ নদীর পাড়ে হার মানছে, আবার হাসবে।
জলবায়ু শরণার্থী শুধু একটি মানবিক সংকট নয়, এটি আমাদের কৃষি, অর্থনীতি ও সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমরা যদি কৃষিকে নতুনভাবে গড়ে তুলি; টেকসই, বিজ্ঞানভিত্তিক, মানবিকভাবে। তাহলে বাংলাদেশ আবার দাঁড়াবে নিজের পায়ে, মাটির গন্ধে, ফসলের গানে। কারণ, বাংলাদেশ বাঁচে কৃষিতে, কৃষি বাঁচে প্রকৃতিতে, আর প্রকৃতি বাঁচে মানুষে। এই তিনের বন্ধন ভাঙলে হারাবে অস্তিত্ব; আর এই বন্ধন টিকিয়ে রাখাই আমাদের আগামী প্রজন্মের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব।

