প্লাস্টিক নয়, প্রকৃতিবান্ধব সমাধান চাই
প্লাস্টিক নয়, প্রকৃতিবান্ধব সমাধান চাই
আধুনিক জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটাই বিস্তৃত যে, সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা কঠিন। বাজারের ব্যাগ, পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, গৃহস্থালির সামগ্রী প্রায় সর্বত্রই প্লাস্টিকের উপস্থিতি। স্বল্পমূল্য, সহজলভ্যতা ও দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণে এটি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু ব্যবহারের পর এই সুবিধাজনক উপাদানই যখন পরিবেশদূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এর বিকল্প নিয়ে ভাবা জরুরি হয়ে পড়ে। তাই শুধু প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর নয়; বরং এর পরিবর্তে কোন উপাদান ব্যবহার করলে মানুষের প্রয়োজন মিটবে, অথচ প্রকৃতির ওপর চাপ তুলনামূলক কম পড়বে, সেই সমাধান খোঁজার। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার জন্য বহুখাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ৯ কেজিতে পৌঁছেছিল। একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে ব্যবহৃত প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিকের মাত্র ৩১ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান প্লাস্টিকের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। প্লাস্টিক বর্জ্য নালা-নর্দমা বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়াতে পারে, নদী ও জলাশয় দূষিত করে এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। সময়ের সঙ্গে ভেঙে তৈরি হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এই সংকটের সমাধান খুঁজতে বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ ও বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পাট হতে পারে অন্যতম কার্যকর বিকল্প। পাটের ব্যাগ, বস্তা ও অন্যান্য তন্তুভিত্তিক পণ্য বাজারের পলিথিন এবং কিছু ধরনের প্লাস্টিকের মোড়কের ব্যবহার কমাতে পারে। বাংলাদেশের পাটশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থা এই বিকল্পকে বিশেষ সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। পাটের পণ্যের নকশা, স্থায়িত্ব ও মান উন্নত করা গেলে সেগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারে আরও জনপ্রিয় হতে পারে। এতে প্লাস্টিকের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। তবে পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পাটের ব্যাগ একাধিকবার ব্যবহার করা এবং উৎপাদনে সম্পদের অপচয় কমানো জরুরি। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের ব্যাগও কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে নিয়মিত কেনাকাটায়। তবে প্রতিটি ব্যবহারের জন্য নতুন ব্যাগ তৈরি না করে একটি টেকসই ব্যাগ দীর্ঘদিন ব্যবহার করাই বেশি যুক্তিসংগত। একইভাবে, পানির বোতল ও খাবার বহনের পাত্রের ক্ষেত্রে স্টেইনলেস স্টিল, কাচ কিংবা উপযুক্ত সিরামিকের পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহার করা যায়। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ, প্লেট ও চামচের পরিবর্তে এসব পাত্র ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। রেস্তোরাঁ ও খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফেরতযোগ্য পাত্র চালু করলে প্রতিবার নতুন প্যাকেজিংয়ের প্রয়োজনও কমবে। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে কাগজ, বাঁশ, বেত এবং অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুকনো খাবার, উপহারসামগ্রী ও কিছু ভোগ্যপণ্যের মোড়কে উপযুক্ত কাগজের প্যাকেজিং ব্যবহার করা সম্ভব। বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি কিংবা পাত্রও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের বিকল্প হতে পারে। তবে কাগজের মোড়কে প্লাস্টিকের আস্তরণ ব্যবহার করা হলে সেটি পুনর্ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে। আবার সব ধরনের খাবার বা তরল পদার্থের জন্য কাগজ উপযুক্ত নয়। তাই বিকল্প নির্বাচন করতে হবে পণ্যের ধরন, স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা এবং ব্যবহারের পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ বিবেচনা করে। প্রকৃতিবান্ধব বিকল্প উদ্ভাবনে বিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভুট্টার শ্বেতসার, আখের উপজাত এবং অন্যান্য জৈবভিত্তিক কাঁচামাল থেকে কিছু ধরনের বায়োপ্লাস্টিক তৈরি করা যায়। ছত্রাকের মাইসেলিয়াম ও কৃষিজ বর্জ্য ব্যবহার করে প্যাকেজিং উপাদান তৈরির প্রযুক্তিও বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে ধানের খড়, পাটের অবশিষ্টাংশ, আখের ছোবড়া এবং অন্যান্য কৃষিজ বর্জ্যকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে গবেষণা বাড়াতে পারলে স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে উঠতে পারে। বিকল্পের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থার প্রসারও জরুরি। কেনাকাটায় নিজের ব্যাগ ব্যবহার, পানির বোতল সঙ্গে রাখা এবং খাবার বহনে টেকসই পাত্র বেছে নেওয়ার মতো অভ্যাস নতুন বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে পারে। সুপারশপ ও অনলাইন পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাকেজিং চালু করতে পারে। বোতল বা পাত্র ফেরত দিলে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা এবং বাজারে বর্জ্য পৃথকীকরণ কার্যক্রমও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে যেসব প্লাস্টিকের নিরাপদ পুনর্ব্যবহার সম্ভব, সেগুলো সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাশ্রয়ী বিকল্পের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারকে পরিবেশবান্ধব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা দিতে হবে। উৎপাদকদের বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারে দায়িত্বশীল করতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা ও বাস্তব কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বিশেষ করে পাট ও কৃষিজ বর্জ্যভিত্তিক পণ্যের গবেষণা, মানোন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প খোঁজা মানে কেবল একটি উপাদানের জায়গায় অন্যটির প্রতিস্থাপন নয়; বরং আমাদের উৎপাদন, ভোগ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধরন পরিবর্তন করা। বাজারের ব্যাগে পাট, খাবার পরিবেশনে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পাত্র, উপযুক্ত প্যাকেজিংয়ে কাগজ ও উদ্ভিদভিত্তিক উপাদান এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরীক্ষিত নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সব ক্ষেত্রে একটিমাত্র বিকল্প কার্যকর হবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক উপাদান নির্বাচনই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে
বাংলাবাজার পত্রিকা
পত্রিকায় প্রকাশিত।
