প্রকৃতি রক্ষাই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ
প্রকৃতি রক্ষাই ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ
অর্থনীতির সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা সাধারণত প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, বিনিয়োগ, রপ্তানি কিংবা কর্মসংস্থানের দিকে আলোকপাত করি। কিন্তু যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রতিবেশব্যবস্থা এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টিকিয়ে রাখে, তার মূল্য অনেক সময় অর্থনীতির প্রচলিত হিসাবের বাইরে রয়ে যায়। অথচ স্বচ্ছ পানি, উর্বর মাটি, বন, নদী, জলাভূমি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় প্রতিবেশ এসব কেবল পরিবেশের উপাদান নয়; এগুলো একটি দেশের অর্থনীতির মৌলিক সম্পদ। তাই প্রকৃতি রক্ষাকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সময় এখন সময়ের আগত। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য চেঞ্জিং ওয়েলথ অব নেশনস ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ পরিমাপ করতে শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি যথেষ্ট নয়। একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ ও উৎপাদিত সম্পদ সবকিছুকে বিবেচনায় নিতে হয়। কারণ বন ধ্বংস, মাছের মজুত কমে যাওয়া , মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে জিডিপির হিসাবে বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা নাও দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতাকেই দুর্বল করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ১৯৯৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে মাথাপিছু নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। প্রকৃতির সঙ্গে অর্থনীতির এই সম্পর্ক বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বনজ সম্পদ ও পর্যটনের মতো খাত সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। আবার শিল্প ও নগর অর্থনীতিও পরোক্ষভাবে পানি, ভূমি, জ্বালানি, কাঁচামাল ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে। ফলে নদী দূষিত হলে শুধু মাছের ক্ষতি হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় মৎস্যজীবী, কৃষক, নৌপরিবহন, পর্যটন এবং মানুষের স্বাস্থ্যও। একইভাবে জলাভূমি ভরাটের ফলে শুধু একটি প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারায় না, বরং বৃষ্টির পানি ধারণের ক্ষমতা কমে গিয়ে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩–২০৫০ এ বলা হয়েছে, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমতল ও নিচু ভূমি, উচ্চ জনঘনত্ব এবং কৃষি, মৎস্য ও পানি সম্পদের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতের ওপর নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে প্রভাবিত করতে পারে। এই বাস্তবতায় প্রকৃতি সংরক্ষণকে উন্নয়নের বিপরীত শক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রকৃতি রক্ষাই হতে পারে অর্থনীতিকে অধিক স্থিতিশীল ও দুর্যোগসহনশীল করার অন্যতম কৌশল। একটি বন যেমন জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল, তেমনি তা পানি সংরক্ষণ, মাটি রক্ষা, স্থানীয় জীবিকা ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতে পারে। জলাভূমি অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতির অনেক সেবা এমন অবকাঠামোগত সুবিধা দেয়, যার বিকল্প কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। প্রকৃতিকে রক্ষার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো কৃষি। মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং কৃষিজমির অপরিকল্পিত ব্যবহার খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই টেকসই কৃষি, মাটির জৈবগুণ সংরক্ষণ, পানি ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জাত সংরক্ষণ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। এতে একই সঙ্গে কৃষকের আয়, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশ। তিনটিই সুরক্ষিত হতে পারে। প্রকৃতি রক্ষার সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানেরও সম্পর্ক রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব কৃষি, ইকো-ট্যুরিজম, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, পানি ব্যবস্থাপনা, বন পুনরুদ্ধার ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান। এসব খাতে ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হতে পারে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ২০২৬ সালের ‘স্টেট অব ফাইন্যান্স ফর নেচার’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে বৈশ্বিক অর্থপ্রবাহ ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার। প্রতিবেদনটি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানে বার্ষিক বিনিয়োগ ৫৭১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। তাই এখন প্রয়োজন প্রকৃতিকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসা। জাতীয় বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ক্ষতির প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনা করা যেতে পারে। বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন আরও কার্যকর করতে হবে। নদী, বন, জলাভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দূষণকারী শিল্পকে শুধু জরিমানা নয়, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের জন্য প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের উন্নয়নের ধারণা বদলানো। আজ একটি নদী ভরাট করে হয়তো জমির দাম বাড়বে, কিন্তু আগামী দিনে সেই নদীর অনুপস্থিতির অর্থনৈতিক ক্ষতি কে বহন করবে? আজ একটি বন কেটে হয়তো দ্রুত কোনো প্রকল্প তৈরি হবে, কিন্তু ভবিষ্যতের বন্যা, তাপপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্যহানি কিংবা জীবিকার ক্ষতির মূল্য কত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া উন্নয়নের হিসাব পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণের জন্য। আর মানুষের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও নিরাপত্তার ভিত্তি প্রকৃতি। তাই প্রকৃতিকে রক্ষা করা উন্নয়নের পথে বাধা নয়; বরং উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাংকের সম্পদ-পরিমাপের ধারণাতেও প্রাকৃতিক পুঁজিকে ভবিষ্যৎ উৎপাদনক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আজ প্রকৃতি রক্ষায় যে অর্থ ব্যয় হবে, তা আগামী দিনে দুর্যোগ মোকাবিলা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, খাদ্যসংকট ও সম্পদহানির ব্যয় কমাতে পারে। টেকসই অর্থনীতির পথে এগোতে হলে সেই হিসাব এখনই খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ প্রকৃতি শুধু আমাদের বর্তমানের সম্পদ নয়; এটি আগামী প্রজন্মের অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও আমানত।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে
দৈনিক মানবকণ্ঠ
পত্রিকায় প্রকাশিত।
