মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আদি ইতিহাস

Author

Mohammad Nahidul Islam , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৬৬ বার

ব্যাংক ছিল না, তবুও ইসলামী অর্থনীতিতে ব্যাংকিং চলতো কীভাবে?

মুহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম

 

রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপের বাণিজ্যপথগুলো ভেঙে পড়েছিল, শহরগুলো ছোট হয়ে আসছিল এবং অর্থনীতিও ক্রমে গুটিয়ে যাচ্ছিল। এই অস্থির সময়ে দুনিয়ার দুই মহাশক্তি ছিল পূর্ব রোম বা বাইজান্টাইন এবং পারস্য। তাদের মাঝখানে আরব উপদ্বীপ ছিল বাণিজ্যের এক নীরব সেতু, আর সেই সেতুর কেন্দ্রে ছিল মক্কা। সেখানে বাইজান্টাইন স্বর্ণমুদ্রা দিনার এবং পারসিক রৌপ্যমুদ্রা দিরহাম হাতবদল হতো; কাফেলা যেত সিরিয়া থেকে ইয়েমেন। কিন্তু তখনো ব্যাংক নামের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না।

তাই মানুষের সামনে তিনটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল: সঞ্চয় নিরাপদে রাখা যায় কোথায়? ব্যবসার পুঁজি খাটানো যায় কীভাবে? আর এক শহর থেকে আরেক শহরে অর্থ পাঠানো যায় কেমন করে? আজকের ভাষায় এগুলোই ব্যাংকিংয়ের তিনটি মৌলিক কাজ: জমা, বিনিয়োগ এবং অর্থ স্থানান্তর।

মক্কার বাজারে এই প্রয়োজন মেটানোর তিনটি পথ চালু ছিল। কেউ বিশ্বস্ত কারও কাছে অর্থ আমানত হিসেবে রাখত। কেউ অন্যের ব্যবসায় পুঁজি দিয়ে লাভের অংশীদার হতো, যা আজকের ভাষায় প্রফিট-শেয়ারিং। আর কেউ সুদে ঋণ দিত। ইসলাম প্রথম দুটি পথ গ্রহণ করেছে, কিন্তু তৃতীয়টি নিষিদ্ধ করেছে। কারণ সুদের বোঝা পড়ত দুর্বল ঋণগ্রহীতার কাঁধে, অথচ ব্যবসার ঝুঁকি বহন করত না পুঁজির মালিক। এখান থেকেই ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি গড়ে উঠেছে—লাভ ও ঝুঁকির ন্যায়্য ভাগাভাগি।

কুরআন রিবা বা সুদ পরিত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে: “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা ঈমানদার হও।” (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
আবার পরিশ্রম ও ন্যায়সঙ্গত উপার্জনের নীতি ঘোষণা করেছে: “মানুষের জন্য রয়েছে কেবল তার চেষ্টার ফল।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)

এই ব্যবস্থার প্রথম ভিত্তি ছিল আস্থা, আর আস্থার সবচেয়ে বড় প্রতীক ছিলেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। তাঁর উপাধি ছিল আল-আমীন, অর্থাৎ বিশ্বাসী। মানুষ নির্ভাবনায় তাঁর কাছে সম্পদ আমানত রেখে যেত। হিজরতের রাতেও শত্রুদের গচ্ছিত সম্পদ তাঁর কাছে ছিল। তিনি আলী (রা)-কে দায়িত্ব দিয়ে মক্কায় থেকে গেলেন, যাতে সবার আমানত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আলী (রা)-কে মক্কায় কিছুদিন অবস্থান করে মানুষের আমানত ফেরত দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ)

 

আধুনিক ব্যাংকের টিকে থাকা যে বিশ্বাসযোগ্যতার (credibility) ওপর নির্ভর করে, এখানে তারই প্রথম পাঠ পাওয়া যায়। কুরআন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর চরিত্রের প্রশংসা করে বলেছে: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।” (সূরা আল-ক্বলাম: ৪)

 

আমানত থেকে এবার বিনিয়োগের দিকে আসা যাক। খাদিজা (রা) পুঁজি দিলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ব্যবসা পরিচালনা করলেন। লাভ হলে দুজনে তা ভাগ করে নিলেন। লোকসান হলে পুঁজির ক্ষতি বহন করতেন পুঁজিমালিক, আর ব্যবসায়ীর পরিশ্রম ব্যর্থ হতো। এই চুক্তির নাম মুদারাবা। ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী, খাদিজা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সততা ও আমানতদারিতার কথা শুনে তাঁকে নিজ পণ্যসহ সিরিয়ায় বাণিজ্যের জন্য পাঠান এবং লাভের নির্দিষ্ট অংশ দিতেন। (ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ)

 

আজকের ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ-কাঠামো মূলত এই মুদারাবা নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে ব্যাংক শুধু ঋণদাতা নয়; বরং ব্যবসার অংশীদার। ফলে লাভ ও ক্ষতি উভয় পক্ষের মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হয়।

 

ব্যক্তিগত লেনদেনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও ছিল। বাইতুল মাল ছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগার—আজকের ভাষায় পাবলিক ট্রেজারি; কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়। ধনীদের কাছ থেকে আদায়কৃত যাকাত, উশর ও দান সেখান থেকে অভাবীদের কাছে পৌঁছাত। অর্থাৎ সম্পদ পুনর্বণ্টনের একটি সামাজিক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠেছিল।

 

ব্যাংকিংয়ের কারিগরি বুদ্ধিমত্তার একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় সাহাবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা)-এর কাজে। মানুষ তাঁর কাছে অর্থ রেখে যেতে চাইলে তিনি তা আমানত হিসেবে না নিয়ে কর্জ বা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতেন। সহিহ বুখারিতে এসেছে, কেউ অর্থ নিয়ে এসে আমানত হিসেবে রেখে গেলে যুবাইর (রা) বলতেন, “না, বরং এটি আমার কাছে কর্জ হিসেবে থাকবে, কারণ আমি এটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১২৯)
এতে দুটি সুবিধা ছিল। প্রথমত, আমানতের অর্থ ব্যবহারের অধিকার গ্রহীতার থাকে না, কিন্তু কর্জ হিসেবে গৃহীত অর্থ তিনি ব্যবসায় খাটাতে পারতেন। দ্বিতীয়ত, কর্জ মানেই ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব; ফলে জমাদানকারীর অর্থ আরও নিরাপদ থাকত। এর সঙ্গে আজকের চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ধারণার একটি আদি রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।

 

একই হাদিসে যুবাইর (রা)-এর ঋণের পরিমাণও উল্লেখ আছে। বর্ণনায় এসেছে, তাঁর ঋণের হিসাব করে দেখা গিয়েছিল তা বাইশ লাখ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১২৯) অর্থাৎ তাঁর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছিল, যা সে যুগের প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল জমা-ভিত্তি ছিল।

 

এরপর আসে অর্থ স্থানান্তরের সমস্যা। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেই এর সমাধানের সূচনা দেখা যায়। ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কায় কেউ ইবনে আব্বাস (রা)-এর কাছে দিরহাম জমা দিলে তিনি তা গ্রহণ করে একটি স্বীকারপত্র লিখে দিতেন, যাতে অর্থ প্রাপ্তির কথা উল্লেখ থাকত। সেই পত্র নিয়ে মানুষ কুফায় গিয়ে নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারত। এটি আজকের ব্যাংক ড্রাফট, প্রমিসরি নোট বা হুন্ডির আদি রূপ বলে বিবেচনা করা যায়।

 

আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা)-এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি চালু ছিল। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মক্কায় অর্থ গ্রহণ করে স্বীকারপত্র পাঠাতেন এবং ইরাকে তাঁর ভাই মুসআব সেই পত্রের ভিত্তিতে নগদ অর্থ পরিশোধ করতেন। ফলে পথিমধ্যে ডাকাতি বা নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যেত। একই পরিবারের দুই ভাই দুই প্রান্তে বসে এই লেনদেন পরিচালনা করতেন; যা আধুনিক ব্যাংকের শাখা-নেটওয়ার্কের একটি আদি রূপ বলে মনে করা যায়।

 

এখানে মক্কার জমাদানকারী এবং ইরাকের অর্থগ্রহীতার মাঝখানে ভরসার ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়: লিখিত স্বীকারপত্র এবং সেই পত্রের পেছনে থাকা ব্যক্তির সততা। অর্থাৎ প্রযুক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আগে এই ব্যবস্থার প্রাণ ছিল আস্থা।
সময়ের সঙ্গে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়। উমাইয়া যুগে, বিশেষত হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের আমলে, দূরবর্তী অর্থ স্থানান্তর আরও সংগঠিত রূপ পায়। পরবর্তীকালে হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে হুন্ডি এবং মুদ্রা বিনিময় বা ফরেক্স ব্যবসা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়।

আজ আমাদের হাতে স্মার্টফোন, মোবাইল ব্যাংকিং এবং এক ক্লিকে সীমান্ত পেরোনো লেনদেনের সুবিধা রয়েছে। কিন্তু একটু থেমে ভাবলে দেখা যায়, এই সবকিছুর শিকড় পোঁতা আছে অনেক পুরোনো এক মাটিতে। মক্কার বাজারে একটি কাগজের টুকরো, একজন মানুষের সততা এবং দুই ভাইয়ের পারস্পরিক ভরসা—সেদিন এটুকুই ছিল পুরো ব্যবস্থার প্রাণ।
ব্যাংকের ভল্ট, সফটওয়্যার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসেছে অনেক পরে। আগে এসেছিল আস্থা। প্রযুক্তি অর্থের লেনদেনকে সহজ করেছে, প্রতিষ্ঠান তাকে দিয়েছে কাঠামো; কিন্তু অর্থনৈতিক সম্পর্ককে টেকসই করতে আজও প্রয়োজন সততা, ন্যায়সংগত আচরণ ও দায়বদ্ধতা।

 

মুহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক: সাধারণ সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।