হিসবা: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় বাজার তদারকি ও ভোক্তা সুরক্ষার প্রতিষ্ঠান
হিসবা: ইসলামি অর্থব্যবস্থায় বাজার তদারকি ও ভোক্তা সুরক্ষার প্রতিষ্ঠান
– মুহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম
এক বাজারে খাদ্যশস্যের স্তূপের ভেতরে হাত ঢোকালেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। ওপরের অংশ শুকনো, কিন্তু আঙুলে ঠেকল ভেজা মাল। তিনি জানতে চাইলেন, “এটি কী?” বিক্রেতা বললেন, “বৃষ্টির পানি লেগেছে, হে আল্লাহর রাসুল।” নবিজি বললেন, “তাহলে ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পায়? যে ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২; আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত)
এই ছোট্ট ঘটনায় বাজার-শাসনের তিনটি প্রশ্ন একসঙ্গে ধরা পড়ে। প্রতারণা কীভাবে শনাক্ত হবে? ক্রেতা কতটুকু সত্য জানার অধিকার রাখেন? আর বিক্রেতার নৈতিক দায় কোথায় শুরু হয়? এই তিন প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই ইসলামের ইতিহাসে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, তার নাম হিসবা। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব, হিসবার শরয়ি ভিত্তি কী, নবি-যুগ থেকে অটোমান আমল পর্যন্ত এটি কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে, মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফকিহদের মতভেদ কেমন ছিল, এবং আজকের বাংলাদেশের ভোক্তা সুরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে এর মিল ও অমিল কোথায়।
১. হিসবার ধারণা ও শরয়ি ভিত্তি
‘হিসবা’ শব্দটি এসেছে ‘ইহতিসাব’ ধাতু থেকে, যার মূল ভাব হিসাব নেওয়া, জবাবদিহি চাওয়া এবং প্রতিদানের আশায় কাজ করা। পরিভাষায় হিসবা হলো ‘আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার’ অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের রাষ্ট্রীয়ভাবে সংগঠিত রূপ।
আল-মাওয়ার্দির সংজ্ঞায়: সৎকাজ প্রকাশ্যে বর্জিত হলে তার আদেশ দেওয়া, আর অসৎকাজ প্রকাশ্যে করা হলে তা থেকে নিষেধ করা। (আল-মাওয়ার্দি, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, হিসবা অধ্যায়) এই দায়িত্ব যিনি পালন করেন, তিনি মুহতাসিব।
সবচেয়ে প্রত্যক্ষ কুরআনি ভিত্তি এই আয়াত:
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪)
লক্ষ করার বিষয়, আয়াতটি দায়িত্বকে কেবল ব্যক্তির বিবেকের ওপর ছেড়ে দেয়নি; কথা বলেছে একটি সংগঠিত ‘দল’-এর। অধিকাংশ মুফাসসির ‘মিনকুম’-এর ‘মিন’ অব্যয়কে আংশিকতাবোধক ধরে একে ফরজে কিফায়া বলেছেন, অর্থাৎ সমাজের একাংশ পালন করলে বাকিদের ওপর থেকে দায় নামে। জামাখশারির মতো কেউ কেউ ‘মিন’-কে ব্যাখ্যামূলক ধরে সবার ওপর দায়িত্বের কথা বলেছেন। (জামাখশারি, *আল-কাশশাফ*, সুরা আলে ইমরান ১০৪ আয়াতের তাফসির) দায়িত্বটি যে পারস্পরিক, তার ইঙ্গিত আছে আরেকটি আয়াতে:
> “মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।” (সুরা আত-তাওবা, আয়াত ৭১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দায়িত্বের স্তরবিন্যাসও বলে দিয়েছেন:
> “তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে। তাতে সক্ষম না হলে মুখ দিয়ে, তাতেও সক্ষম না হলে অন্তর দিয়ে (ঘৃণা করে)। আর এটি ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৯; আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত)
হাতের স্তর বলতে সাধারণত ক্ষমতাধারী কর্তৃপক্ষের প্রতিরোধ বোঝানো হয়। হিসবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মূলত এই প্রথম স্তরকেই একটি স্থায়ী পদে রূপ দিয়েছে।
বাজারের নৈতিকতা নিয়ে কুরআনের ভাষা আরও সরাসরি:
> “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়; যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় নেয়, আর যখন তাদের জন্য মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।” (সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩)
> “হে মুমিনগণ, তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ২৯)
আর শাসকের দায়িত্বের দিক থেকে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে, আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতে।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮)
২. নবি (সা.)-এর যুগে বাজার তদারকি
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল উপদেশ দিয়েই থামেননি, নিজে বাজারে গিয়েছেন, পণ্য যাচাই করেছেন, ওজন ঠিক আছে কি না দেখেছেন। এক বিক্রেতাকে তিনি বলেছিলেন, “ওজন করো এবং একটু ঝুঁকিয়ে (বেশি) দাও।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৩৬; জামে তিরমিযি, হাদিস ১৩০৫) অর্থাৎ নবিজির নীতি কেবল কম না দেওয়া নয়, ক্রেতার প্রতি উদারতাও।
তাঁর অবস্থানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যও ছিল। একদিকে প্রতারণা ও মজুতদারি নিষিদ্ধ। মজুতদারি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “পাপী ছাড়া কেউ মজুতদারি করে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬০৫)
৩. খুলাফায়ে রাশিদিনের আমল
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজে নিয়মিত মদিনার বাজার ঘুরে দেখতেন। এই আমলের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-কে নিয়ে। উমর (রা.) বাজারে দেখলেন, তিনি কিশমিশ বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছেন। উমর তাঁকে বললেন, হয় দাম বাড়াও, নয়তো আমাদের বাজার ছেড়ে যাও। (মালিক ইবনে আনাস, *আল-মুয়াত্তা*, বেচাকেনা অধ্যায়)
ঘটনার পরের অংশ আরও কৌতূহলোদ্দীপক। বায়হাকির বর্ণনা অনুযায়ী উমর (রা.) পরে হাতিবের বাড়িতে গিয়ে বলেন, তাঁর ওই কথা বাধ্যতামূলক আদেশ বা চূড়ান্ত ফয়সালা ছিল না; শহরবাসীর স্বার্থে একটি পরামর্শ দিয়েছিলেন মাত্র, তাই হাতিব যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারেন। (বায়হাকি, *আস-সুনানুল কুবরা*) এই বর্ণনা ধরেই পরবর্তী ফকিহরা প্রশ্ন তুলেছেন, স্বাভাবিক বাজারে শাসক কি ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারেন? এই আলাপ একটু পরেই দিচ্ছি।
# নারীদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব :
ইসলামী খেলাফত আমলে নারীরাও বাজারে ব্যবসা করতেন। এমনকি হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে শাফা বিনতে আবদুল্লাহ নামক একজন যোগ্য নারীকে মদিনার বাজারের ‘মুহতাসিব’ বা বাজার পরিদর্শক/নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন সময়ে বাজার ব্যবস্থাপনায় নারীদের উচ্চ মর্যাদার প্রমাণ দেয়।
৪. আব্বাসি যুগ: মুহতাসিব পদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ
আব্বাসি যুগে হিসবা বেতনভুক্ত সরকারি পদের রূপ নেয় এবং বাগদাদের মতো বড় শহরে মুহতাসিব নিয়োগ হতে থাকে। এই পর্যায়ে হিসবা নিয়ে নিজস্ব সাহিত্যও গড়ে ওঠে, যাকে বলা হয় হিসবা-নির্দেশিকা।
সাহিত্যটি ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ছিল। সিরিয়ায় আশ-শাইজারি লেখেন *নিহায়াতুর রুতবা ফি তালাবিল হিসবা*। আন্দালুসে সেভিলের ইবনে আবদুন বিচার ও হিসবা নিয়ে একটি পুস্তিকা রচনা করেন। আর মামলুক মিশরে ইবনুল উখুওয়া (মৃ. ১৩২৯) রচনা করেন *মাআলিমুল কুরবা ফি আহকামিল হিসবা*, যা রুবেন লেভির সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে আধুনিক গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হয়েছে। এসব গ্রন্থ ধর্মীয় উপদেশের পাশাপাশি মধ্যযুগীয় শহরের বাস্তব জীবন, অর্থাৎ রুটি তৈরি, মাংস বিক্রি, কাপড়ের মাপ ও রাস্তাঘাটের অবস্থা বোঝার মূল্যবান দলিল।
তাত্ত্বিক দিক থেকে ইবনে খালদুন (*মুকাদ্দিমা*) হিসবাকে খিলাফতের ধর্মীয় পদগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করেছেন, যার উৎস আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার।
৫. মুহতাসিবের কার্যপরিধি ও এখতিয়ারের সীমা
এসব গ্রন্থ থেকে মুহতাসিবের কাজের বাস্তব ছবি আঁকা যায়। তিনি বাজারে ঢুকে প্রথমেই দেখতেন বাটখারা ও দাঁড়িপাল্লা ঠিক আছে কি না। এরপর নজর দিতেন খাদ্যপণ্যে: ঘি বা মধুতে ভেজাল, ওপরে ভালো মাল আর নিচে নষ্ট মাল রাখা, পুরোনো পণ্য নতুনের সঙ্গে মেশানো। পরিচ্ছন্নতা, নর্দমার পানি, পথ দখল, কসাইখানার স্বাস্থ্য ও জনচলাচলে বাধা, এসবও ছিল তাঁর দায়িত্ব। কারিগর ও শ্রমিকের চুক্তিবদ্ধ মজুরি আটকে রাখা হচ্ছে কি না, তাও দেখতেন। আধুনিক ভাষায় ওজন-পরিমাপ পরিদর্শক, খাদ্য-নিরাপত্তা কর্মকর্তা, পৌর পরিদর্শক ও শ্রম পরিদর্শকের কাজ একজন ব্যক্তির হাতে ছিল।
তবে মুহতাসিব বিচারক ছিলেন না। আল-মাওয়ার্দি তাঁর এখতিয়ার ও কাজির এখতিয়ারের পার্থক্য আলোচনা করেছেন। মুহতাসিব কোনো অভিযোগ ছাড়াই, প্রকাশ্য ও স্পষ্ট অনিয়মে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। তাঁর শাস্তি ছিল সংশোধনমূলক, যাকে তাযির বলা হয়: পণ্য জব্দ, জরিমানা, সতর্কীকরণ বা বাজার থেকে বহিষ্কার। কিন্তু যেখানে বাদী-বিবাদী আছে, প্রমাণ ও সাক্ষ্য লাগে, সেই জটিল বিরোধ যেত কাজির কাছে। আর শাসক ও ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনার জন্য ছিল মাযালিম আদালত। ইসলামি প্রশাসনিক তত্ত্বে তাই হিসবা, কাজা ও মাযালিম, এই তিন এখতিয়ারের সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
৬. মূল্য নিয়ন্ত্রণ: ফিকহি মতভেদ
বাজারে হস্তক্ষেপের সীমা নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কের সূত্র এই হাদিস। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, মদিনায় দাম বেড়ে গেলে লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসুল, দাম বেড়ে গেছে, আমাদের জন্য দাম বেঁধে দিন।” তিনি বললেন:
> “নিশ্চয়ই আল্লাহই দাম নির্ধারণকারী, সংকুচিতকারী, প্রসারকারী ও রিযিকদাতা। আমি আশা করি, আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করব যে তোমাদের কেউ রক্ত বা সম্পদের কোনো জুলুমের দাবি আমার বিরুদ্ধে করবে না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৫১; জামে তিরমিযি, হাদিস ১৩১৪)
এই হাদিস ও উমর-হাতিব ঘটনাকে ঘিরে ফকিহদের অবস্থান কয়েক ধারায় ভাগ হয়েছে। শাফিয়ি মাযহাব এবং হাম্বলি মাযহাবের ইবনে কুদামার মতো ফকিহরা সাধারণভাবে প্রশাসনিক দাম নির্ধারণকে ব্যবসায়ীর সম্পদের ওপর জুলুম মনে করেন। মালিকি মাযহাবের অবস্থান তুলনামূলক নমনীয়, তাঁরা জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণের অবকাশ দেখেন। হানাফি ফকিহরা সাধারণ অবস্থায় দাম বাঁধার বিরোধী, তবে মানুষের স্পষ্ট ক্ষতি হলে শাসককে অনুমতি দেন। অর্থাৎ বিতর্কটি ‘বৈধ কি অবৈধ’ এই দুই মেরুর ছিল না; প্রশ্ন ছিল কোন পরিস্থিতিতে কিরূপ ভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়া।
৭. হিসবা’র তাত্ত্বিক রূপায়ন :
হিসবাকে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় তত্ত্বে রূপ দেন ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর *আল-হিসবা ফিল ইসলাম* গ্রন্থে। এর ইংরেজি অনুবাদ *Public Duties in Islam: The Institution of the Hisba* (অনুবাদ: মুহতার হল্যান্ড, সম্পাদনা: খুরশিদ আহমদ, লেস্টার: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮২)। তাঁর মূল যুক্তি, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ক্ষমতা চর্চা নয়, জনকল্যাণ ও অধিকার সংরক্ষণ। তাঁর মতে রাষ্ট্রকে দুই বিপরীত ঝুঁকি এড়াতে হবে: নৈতিক উদাসীনতা এবং অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ।
মূল্য নিয়ন্ত্রণে তাঁর অবস্থান সূক্ষ্ম। স্বাভাবিক চাহিদা ও জোগানের ফলে দাম বাড়লে জোর করে দাম বেঁধে দেওয়া জুলুম। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যদি মজুতদারি বা একচেটিয়া কারসাজি করে মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রাখে, তখন ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ বৈধ, এমনকি জরুরি হয়ে পড়ে। শিষ্য ইবনুল কাইয়িম এই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে দাম নির্ধারণকে দুই ভাগে দেখেছেন: জুলুমমূলক নির্ধারণ, যা হারাম, আর ন্যায়সংগত নির্ধারণ, যা জায়েজ। (ইবনুল কাইয়িম, *আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা ফিস সিয়াসাতিশ শরইয়্যা*) এই দুই চিন্তাবিদের অবদান হলো, হিসবাকে নৈতিক উপদেশ থেকে জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক তত্ত্বে উত্তীর্ণ করা।
৮. অটোমান আমলে ইহতিসাব ও পরবর্তী পরিণতি
অটোমান সাম্রাজ্যে হিসবা পেল আইনের লিখিত রূপ। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের মোড়ে দ্বিতীয় বায়েজিদের আমলে ইস্তাম্বুলের জন্য ‘ইহতিসাব কানুননামা’ পাওয়া যায়, যেখানে পণ্যের দামের তালিকা , অনুমোদিত মুনাফার হার এবং অনিয়মের শাস্তির বিধান ছিল। এই ব্যবস্থায় মুহতাসিব কাজির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতেন। উনিশ শতকের তানজিমাত সংস্কারে মুহতাসিব পদ বিলুপ্ত হয়ে তার জায়গায় আধুনিক পৌর প্রশাসন আসে। আজকের সিটি কর্পোরেশন ও বাজার কমিটির অনেক কাজে সেই ধারার ছায়া দেখা যায়।
৯. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ভোক্তা সুরক্ষা কাঠামো
আজ ‘মুহতাসিব’ নামের পদ নেই, কিন্তু তাঁর কাজের চরিত্র অন্য নামে টিকে আছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ উত্তরসূরি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, যা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন)-এর অধীনে কাজ করে। বাজারে সরাসরি গিয়ে অভিযান চালানো এবং সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা করার পদ্ধতিতে মুহতাসিবের ধারার মিল স্পষ্ট।
সাম্প্রতিক চিত্রটি এই রকম। ৬ অক্টোবর ২০২৬ ঢাকা মহানগরসহ ৩৮ জেলায় অভিযান চালিয়ে ৯৫টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। (যুগান্তর, ৬ অক্টোবর ২০২৬) ১১ অক্টোবর ৩১ জেলার অভিযানে জরিমানা হয় ৮৭টি প্রতিষ্ঠান, পরিমাণ ৭ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা। অভিযানের কেন্দ্রে ছিল এলপি গ্যাস ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম, সরবরাহ ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়। (বিডিনিউজ২৪ডটকম, ১১ অক্টোবর ২০২৬) ভোক্তারা অভিযোগ জানাতে পারেন হটলাইন ১৬১২১-এ, যা মুহতাসিবের কাছে সরাসরি অভিযোগ পৌঁছানোর আধুনিক রূপ।
বাজারের প্রতিযোগিতা-বিরোধী আচরণ দেখে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, যা প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২-এর অধীনে গঠিত। একচেটিয়া কারসাজি ও সিন্ডিকেট এর এখতিয়ারভুক্ত, যা মুহতাসিবের মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট দমনের কাজের উত্তরাধিকার। পণ্যের মান দেখে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), আর খাদ্যের নিরাপত্তা দেখে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর অধীন বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ।
পার্থক্যটাও স্পষ্ট। মুহতাসিবের শক্তি ছিল তাৎক্ষণিকতা, বাজারে নিয়মিত উপস্থিতি ও নৈতিক কর্তৃত্ব। আধুনিক প্রতিষ্ঠানের শক্তি আইনি প্রক্রিয়া ও নথিভিত্তিক প্রমাণ, কিন্তু দুর্বলতা ধীরগতি, একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং একই অনিয়মের ফিরে আসা। অভিযান ও জরিমানা চলছে, অথচ পদ্ধতিগত প্রতিরোধ দুর্বল, এ কথা অনেক পর্যবেক্ষকই বলেন।
মদিনার সেই ভেজা শস্যের স্তূপে ফিরে আসি। নবিজির প্রশ্ন ছিল : ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন? ক্রেতা যা কিনছেন তা দেখার সুযোগ পেলেই বাজার ন্যায্য হয়। এই সত্যের অধিকার, প্রতারণার তাৎক্ষণিক প্রতিকার এবং ব্যবসায়ীর বৈধ মুনাফার প্রতি সম্মান, এই তিনটিই হিসবার স্থায়ী শিক্ষা।
## সূত্রপঞ্জি
**কুরআন**
১. সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪
২. সুরা আত-তাওবা, আয়াত ৭১
৩. সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১–৩
৪. সুরা আন-নিসা, আয়াত ২৯ ও ৫৮
**হাদিস**
৫. সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৯ (অন্যায় প্রতিরোধের তিন স্তর)
৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২ (ভেজাল ও প্রতারণা)
৭. সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬০৫ (মজুতদারি)
৮. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৩৩৬ (ওজনে ঝুঁকিয়ে দেওয়া)
৯. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৫১ (দাম নির্ধারণ)
১০. জামে তিরমিযি, হাদিস ১৩০৫ ও ১৩১৪
**ইতিহাস ও ফিকহগ্রন্থ**
১১. মালিক ইবনে আনাস, *আল-মুয়াত্তা*, বেচাকেনা অধ্যায় (উমর-হাতিব ঘটনা)
১২. বায়হাকি, *আস-সুনানুল কুবরা* (উমরের পরবর্তী ব্যাখ্যা)
১৩. আল-মাওয়ার্দি, *আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা*, হিসবা অধ্যায়
১৪. জামাখশারি, *আল-কাশশাফ*, সুরা আলে ইমরান ১০৪ আয়াতের তাফসির
১৫. আশ-শাইজারি, *নিহায়াতুর রুতবা ফি তালাবিল হিসবা*
১৬. ইবনুল উখুওয়া, *মাআলিমুল কুরবা ফি আহকামিল হিসবা*, সম্পাদনা: রুবেন লেভি
১৭. ইবনে খালদুন, *আল-মুকাদ্দিমা*
১৮. ইবনে তাইমিয়া, *আল-হিসবা ফিল ইসলাম আও ওয়াযিফাতুল হুকুমাতিল ইসলামিয়্যা*
১৯. Ibn Taymiyya, *Public Duties in Islam: The Institution of the Hisba*, translated by Muhtar Holland, edited by Khurshid Ahmad, Leicester: The Islamic Foundation, 1982
২০. ইবনুল কাইয়িম, *আত-তুরুকুল হুকমিয়্যা ফিস সিয়াসাতিশ শরইয়্যা*
**আইন**
২১. ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন)
২২. প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২
২৩. নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩
**সংবাদ প্রতিবেদন**
২৪. “নিত্যপণ্যের বাজারে অভিযান, ৯৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা”, যুগান্তর, ৬ অক্টোবর ২০২৬
২৫. “গ্যাস সিলিন্ডার ও ভোজ্যতেলের বাজারে নজরদারি, ৮৭ প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড”, বিডিনিউজ২৪ডটকম, ১১ অক্টোবর ২০২৬
_______________
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
