কলেজে লোকপ্রশাসন বিভাগ চালু করুন
শিক্ষা হলো একটি জাতিকে উন্নত ও সভ্য জাতিতে পরিণত করার একমাত্র হাতিয়ার। বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি রয়েছে। তবে গতানুগতিক অধিকাংশ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় একই রকম। দেশের শিক্ষার পর্যায় ভাগ করলে বলা যেতে পারে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত অধ্যয়ন করে। এরপর ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেনী পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে, উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করে কলেজে। এরপরেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে দৌড় শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। আসন পর্যাপ্ত না হবার কারণে যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পায়না তারা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজসমূহে স্নাতক শ্রেণীতে অধ্যয়ন করে থাকেন। তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বর্তমানে লক্ষ্যণীয় যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজসমূহে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এক ধরনের অসামজস্যপূর্ণ শিক্ষা প্রদান চলে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনমূখী বিভিন্ন বিভাগ চালু থাকলেও কলেজসমূহে সেই অনুপাতে আধুনিক বিভাগগুলোতে অধ্যয়নের সুযোগ নেই। যেকোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশ পরিচালনায় সফল কিংবা ব্যর্থ হওয়া নির্ভর করে একজন প্রশাসকের উপর। দক্ষ প্রশাসক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন চতুর্মূখী জ্ঞান আহরণ। এক্ষেত্রে যে বিভাগটির কথা উল্লেখ প্রয়োজন তা হলো লোকপ্রশাসন বিভাগ। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংগঠন পরিচালনাসহ বিভিন্ন চতুর্মূখী জ্ঞান প্রদান করা হয় এই বিভাগ থেকে।
লোকপ্রশাসন বিভাগটি দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা সম্পর্কিত একটি বিশাল অধ্যয়নক্ষেত্র। লোকপ্রশাসন অধ্যয়নের কেন্দ্রবিন্দু হলো সরকারের প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনার শিক্ষা গ্রহণ করা। সরকারের এমন কোনো কার্যক্ষেত্র নেই যা এই বিভাগে পড়ানো হয় না। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসন বিষয়টি পড়ানো হয়। এই বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ে লোভনীয় চাকুরি করার সুযোগ রয়েছে। সচিবালয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংক-বীমা, বিভিন্ন মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিসহ দেশ-বিদেশের সর্বত্রই এই বিভাগ থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের রয়েছে বিশেষ চাহিদা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন দেশের সরকারি কলেজসমূহের শিক্ষার্থীরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বিশেষায়িত জ্ঞানে অভিজ্ঞ জনশক্তি থেকে আমাদের জনপ্রশাসন বঞ্চিত হচ্ছে অপরদিকে লোকপ্রশাসন থেকে পাশ করা গ্রাজুয়েটরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ছড়িয়ে দেবার সুযোগ পাচ্ছেন না।
একটি প্রবাদ আছে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থীরা দেশ বানায়, মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা দেশ বাঁচায় আর লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থীরা দেশ চালায় যাদেরকে কিনা বলা হয় ‘Navigators of the Nation’. দেশের একটি বড় সংখ্যার শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজসমূহ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে থাকেন। কিন্তু সেখানে দেশ চালানোর কারিগর গড়ার কারখানায় চালু নেই! একজন শিশুর জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিয়ে, চাকুরিতে প্রবেশ, অবসরগ্রহণ, পেনশন উত্তোলন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি কাজই যেন লোকপ্রশাসনের সাথেই জড়িত। এইজন্য অনেক লোকপ্রশাসনবিদ বলে থাকে, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত মানুষ লোকপ্রশাসনের আওতাভুক্ত।
আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সফলতা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জ্ঞানের উপর। রাষ্ট্রের সফলতা, গতিশীলতা বজায় রাখার জন্য দক্ষ প্রশাসক, সংগঠক প্রয়োজন। লোকপ্রশাসন বিভাগ স্বতন্ত্র একটি বিভাগ হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে। নির্দি¦ধায় বলা যেতে পারে লোকপ্রশাসন একটি সময়োপযোগী বিভাগ। এই বিভাগে একজন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলে দেশ-বিদেশের তুলনামূলক প্রশাসন ব্যবস্থা, সমাজ ও সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে। এছাড়াও মানুষের সাথে বা অন্যপ্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার জন্য জ্ঞান প্রয়োজন তা এই বিভাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে। সুসংহত উন্নয়ন, আদর্শ ও বৈষম্যহীন সমাজ ও গতিশীল প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থাকে কার্যকর রূপে গড়ে তোলার জন্য লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যয়নের কোনো বিকল্প নেই।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌরনীতি ও সুশাসন নামে একটি বই পড়ানো হয় যা লোকপ্রশাসন বিভাগেরই ক্ষুদে ভার্সন। অথচ দুঃখের বিষয় এই যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে লোকপ্রশাসনকে আলাদা বিভাগ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়নি; বাদ পড়ে আছে শিক্ষা ক্যাডার থেকেও। একটি দেশের নাগরিকদের সচেতন করে গড়ে তুলতে লোকপ্রশাসন বিষয়টি সর্বজনীনতার দাবি রাখে। প্রাথমিক স্তরের তৃতীয় শ্রেণীর সামাজিক বিজ্ঞান বই থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লোকপ্রশাসনের ক্ষুদে ভার্সন পড়ানো হলেও স্নাতক শ্রেণীতে এসে তাতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কলেজে স্নাতক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কলেজ পর্যায়ে লোকপ্রশাসন বিভাগ চালু হলে একদিকে যেমন লোকপ্রশাসন বিষয়ক জ্ঞানের আরও বিস্তার লাভ করবে, দেশে আরও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে, বিসিএসে লোকপ্রশাসনের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ক্যাডার অন্তর্ভুক্তি হবে। ফলে নতুন কর্মক্ষেত্রের সৃষ্টি হবে। তাই যুগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে লোকপ্রশাসন বিভাগকে একাডেমিক ডিসিপ্লিন হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষা ক্যাডারে (৪১ তম বিসিএস থেকেই) আওতায় নিয়ে আসা সময়ের যৌক্তিক দাবীতে পরিণত হয়েছে।
