দুষ্টু মিষ্টি স্মৃতিরা যেখানে ঘর বাঁধে।
কিছু কিছু দিন থাকে , কিছু কিছু সময় থাকে যেগুলো সময়ের ব্যবধানে হয়ে উঠে স্মৃতির পাতার এক একটি অমূল্য রত্ন। হয়ে উঠে হয়ে আনমনে হেঁসে উঠার কিছু কারণ। এই রকম একটি দিন ছিল ১৪ ই ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন ভালোবাসা দিবস হওয়ায় মেসের অনেকেই ঘুরতে বেরোচ্ছিল।কেউ প্রেমিকের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়ে আর কেউ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতে। এদিকে আসে পাশের সবার বের হওয়া দেখে আমার রুমমেটের আর ভালো লাগছে না। ও আমাকে একটা গুঁতা দিয়ে বলছে চল বের হয় । যেই ভাবা সেই কাজ নক দিলাম জুলাই ৩৬ হল নিবাসী সামিয়া আর মাকসুদাকে, বললাম:”বের হ জলদি জলদি”।পরে রেডি হয়ে আমি আর আমার রুমমেট বের হয়ে পড়লাম। আনাস হলের কাছাকাছি এসে ঐ দুটাকে আবার মেসেঞ্জারে গুঁতা দিলাম। বললো আসছি দুই মিনিটে।লেট লতিফ দুইটার সেই দুই মিনিট গড়ালো ২০ মিনিটে।তাও তারা নিরুদ্দেশ। বাধ্য হয়ে চলেই গেলাম হলে। গেটের কাছাকাছি যেতেই দেখি হেলতে দুলতে বের হচ্ছে দুজন। মন চাইলো মাথার উপর বাড়ি দি দুইটা। দুইটার পিঠে দুইটা থাপ্পড় দিয়ে কথা বলছিলাম। হঠাৎ খেয়াল গেল প্রকৃতির দিকে। ফাগুনের ছোঁয়ায় প্রকৃতি সেজেছে মোহনীয় এক সাজে। হলের ভেতরের গোলাপ আর গেটের পাশের রং বেরঙের ফুলের মিষ্টি সুগন্ধে মনটা ভরে গেল। এদিকে হাতটা নিসপিস করছে ফুল ছেড়ার জন্য। পরে নিজেকে বুঝালাম থাক এগুলো গাছেই সুন্দর।শুরু হলো ফুলের ফটোসেশন। তার পর গ্ৰুপ ফটো। এমন সময় দেখি একদল প্রেম বঞ্চিত হতভাগা সামনে একটা ব্যানার ঝুলিয়ে হলের সামনের রাস্তা দিয়ে মিছিল করতে করতে যাচ্ছে।” কেউ পাবে কেউ পাবে না, এই অনাচার মানি না”, “একটার বেশি না “,হাবি জাবি কিছু বিরহের স্লোগান।এদের দুঃখ দেখে বিরহে মনে মনে বলছিলাম এদের এতো দুঃখ! বিরহে কচু গাছের সাথে গলাই দড়ি দেয় না ক্যান! যায় হোক চারজন মিলে হাঁসি তামাশা করতে করতে যাচ্ছিলাম ডায়না চত্ত্বরের দিকে। পথিমধ্যে চলতে চলতে পলাশের রক্ত রাঙা লাল রং দেখে আমার রুমমেটকে জ্বালানোর জন্য খোঁচা দিয়ে ছন্দ বলতেই দেখলাম কাজে দিলো, তেলে বেগুন জ্বলে উঠলো।লাগলো দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া। এই ঝগড়া দেখে মাকসুদার মাথা ঘুরা শুরু করছে। বলে তোরা একসাথে থাকিস কেমনে। আসলে আমার অন্যতম একটা কাজই হলো রুমমেটকে জ্বালানো। যে কোন বিরহের কবিতার ছন্দ তাকে খুব জ্বালায়। যায় হোক এভাবে ঝগড়া আর হাঁসি তামাশা করতে করতে ঘোরাঘুরি করলাম সবাই। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম শহীদ মিনার চত্বরে। গোধূলি বেলা সুন্দর আবহাওয়া। সামিয়া বললো আয় একটা গ্ৰুপ পিক তুলি। এখানেই ঘটলো বিপত্তি। চার জনের গ্ৰুপ পিক তুলে দেবে কে ? আমার রুমমেট হুট করে বলে উঠলো ঐ ভাইয়াকে বল।ও এমন ভাবে বলছে যে ভাইয়া শুনে মিষ্টি মিষ্টি হাসাতে লাগছে।তারপর আমার রুমমেট লজ্জায় দৌড় ঐ এলাকা থেকে। এ ভাবেই পাগলামী, হাঁসি মজ্জা উচ্ছাস চললো কিছুক্ষণ। সন্ধ্যা নামলো ,চারিদিকে অন্ধকার তার জাল বিছালো। ক্যাম্পাসের ল্যাম্পপোস্ট গুলো জ্বলে উঠলো।প্রকৃতির যেন অন্য রকম এক সৌন্দর্যের মায়াজালে আবদ্ধ করছিল চারপাশ। যায় হোক এরপর সবাই মিলে চা খেতে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে আর এক বিব্রতকর কাহিনী হলো। এক সিনিয়র আর এক ব্যাচমেট নতুন নতুন প্রেমে জড়িয়েছে তখন মৃদু পায়ে দুজন হাটছিলো। দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু ঘটলো বিপত্তি আমাদের ভিতরের এক পাগলা হুট করে বান্ধবীর নাম নিয়ে ডাক দিলো । ওর মুখ চেপে ধরতে ধরতেই দেখি শুনে ফেলছে দুজন। চরম লজ্জা জনক পরিস্থিতি। যায় হোক সামান্য মান ইজ্জতের ফালুদা বানিয়ে চা খেতে চলে গেলাম সবাই। একে তো বাতাসে ফাগুনের হাজারো ফুলের মৃদু সুবাস তার উপর সন্ধ্যার আলো আঁধারের লিলা খেলা , প্রকৃতির এই রুপে যেন বড্ড বেশি রহস্য। এই আবহাওয়ায় দুধ চা আর হাজারো ফাজলামো এ যেন অন্য রকম এক ব্যাপার। রাত হয়ে যাচ্ছিলো সন্ধ্যা গড়িয়ে তাই জলদি জলদি উঠে পরলাম সবাই। হাঁটতে থাকলাম মেসের উদ্দেশ্যে। ডায়না চত্বরে আসতেই একজন বললো চল সেডো পিক তুলি। পিক উঠানের তোর জোর শুরু হলো। পিক তুলতে যেয়ে এক একটা তিরিং বিরিং করে সেডো বানিয়ে পিক তুললো। তারপর এভাবেই ফাজলামো আর দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া আর গল্প করতে করতে মেসে চলে আসলাম। এভাবেই তৈরি হলো স্মৃতির পাতার একটি রঙিন দিন। যা হয়তো চাইলেও ভুলা সম্ভব না। তৈরি হলো আনমনে হেঁসে উঠার কিছু কারণ। হয়তো একদিন বিশ্ববিদ্যালয় শেষে হাড়িয়ে যাবো সবাই আপন বহমানতায় কিন্তু এই দুষ্টুমি, পাগলামী এগুলোই হয়তো থেকে যাবে স্মৃতি হয়ে। হয়তো বাস্তবতার তাগিদে হবো কৃত্রিম মানুষ,নিরেট সভ্য । কিন্তু এই দুষ্টুমি আর পাগলামী হয়তো বহু বছর পর হাসাবে নির্জন নিরালা কোন এক অলস সময়ে। হয়তো শিক্ষাজীবন আমাদের জীবনের এমন এক সময় দুষ্টু মিষ্টি স্মৃতিরা যেখানে ঘর বাঁধে।
