শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নাম নেই, শুধু রক্তচিহ্ন আছে।

Author

মোছাঃ আহসানা হাবিবা অরনা , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ পাঠ: ১৩ বার

সেদিন ছিল রবিবার, কাঁধে ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে তৌকির তাজমিন আনমনে হাঁটছিল। তার চোখে ছিল জন্মের ক্লান্তি, মুখ ছিল কিছুটা ম্লান। পড়ালেখা, পার্ট-টাইম চাকরি, একটা টিউশনি আর জীবনের টানাপোড়েন- সব একসাথে চালিয়ে যাওয়া আসলে খুব একটা সহজ নয়। তবুও কোনো একদিনের সুখের আশায় হাজারো কষ্ট সহ্য করা এই আরকি। তবে সেই সুদিন যে কতদূর…? তৌকির আনমনে ভেবে চলেছে। আপাতত তার লক্ষ্য মেসে পৌঁছানোর। ঢাকার কোলাহলময় রাস্তা আপাতত তার কাছে অর্থহীন, প্রাণহীন কোনো মরুভূমি। তবে এক কাপ চা খেতে ছোটখাটো একটা স্টলের সামনে একটু দাঁড়ালো তৌকির। “মামা একটা করা লিকারের রং চা…”, একথা বলে সে অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ একটা ছোট ছেলের ডাকে তার কিছুটা হুস ফিরল। ছেলেটির বয়স ৯-১০, এর বেশি হবে না। বস্তির কোনো টুকায় অথবা ভিক্ষুক হবে হয়তো। নোংরা পোশাক, হাতে ছোট একটা নোংরা ব্যাগ। মুখটা সামান্য মলিন, তবে মুখে মায়া মায়া একটা ভাব আছে। ” সকাল থেইকা কিচ্ছু খাই নাই , কয়ডা ট্যাহা দেন” । তৌকির ভালো করেই জানে এদের অধিকাংশই ফ্রড , কেউ কেউ তো আবার বিভিন্ন

‎সংগঠনের হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে। তারপরও কেনো জানি ছেলেটার মলিন মুখের প্রতি তার মায়া হলো।

‎সাতক্ষীরা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্ৰাম থেকে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় বড় হয়ে শহরে পড়তে এসেছে তৌকির, এজন্যই হয়তো ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা বড্ড বেশি পীড়া দেয় তাকে। তৌকির খুব একটা না ভেবে কাছাকাছি একটা দোকান থেকে বড় এক প্যাকেট কেক কিনে দিলো শিশুটিকে। কে জানে হয়তো দরিদ্রতার কষাঘাত কিংবা কোনো অসাধু চক্রের কবলে পরে ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়েছে শিশুটি। ঢাকার শহরে এই রকম পথশিশু বা ভিক্ষুকের সংখ্যা অবশ্য কম না। আসলে প্রতিটি শিশুই সুন্দরভাবে বাঁচার দাবিদার হলেও এই সমাজের বাস্তবতা ভিন্ন । কেউ কেউ সেই সুযোগ পায় আবার কেউবা সমাজের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়। যাই হোক তৌকির আবার তার মেসের দিকে যাত্রা শুরু করলো। নীলক্ষেতের আবাসিক এলাকার একটা মেসে থাকে সে, আপাতত তার গন্তব্য সেখানেই। আসলে তৌকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের ২য় বর্ষে শিক্ষার্থী। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসায় জীবন সংগ্রামের কৃত্রিম লড়াইটা সে ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারে। এভাবেই পড়ালেখা , চাকরি আর বাস্তবতার সাথে লড়াই করে করে কেটে যাচ্ছিল তার জীবন।

‎এর মধ্যেই জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় দেশ উত্তাল হয়ে উঠলো। তার মুখ দিয়েও উত্তাল কন্ঠে উচ্চারিত হলো, ” সারা বাংলাই খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে “,” কোটা না মেধা- মেধা, মেধা।” কিন্তু স্বৈরাচারী শাসক মানলেন না। বললেন, ” মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-নাতনিরা চাকরি পাবে?” । সারাদেশ আবার গর্জে উঠলো, ” আমি কে, তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার।” এভাবেই কোটা আন্দোলন এক সময় রূপ নিলো স্বৈরাচারের পতনের আন্দোলনে। ঢাকার অলি-গলি তরুণদের তাজা রক্ত রঞ্জিত হলো, আশা নিয়ে বসে থাকা মায়ের কোল হলো শূন্য।

‎সেদিন ছিল ৪ আগস্ট, ঢাকাসহ সারাদেশ উত্তাল। মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে কয়েক শত শিক্ষার্থীর লাশের সাক্ষী এদেশ, কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রীর কোথাও কোনো খোঁজ মিলছে না। তৌকির কোনোভাবে এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। তার পার্ট-টাইম চাকরিটা ততদিনে চলে গেছে, এজন্য সামগ্ৰিক অবস্থা ভয়াবহ। এলিফ্যান্ট রোডে এক বন্ধুর বাসায় আত্মগোপন করে কোনো মতো দিন পার হচ্ছিল তার। আন্দোলনে কিছুটা নেতৃত্ব দেওয়ায় তৌকিরের তখন আর নিজের মেসে থাকার উপায় ছিল না। এভাবেই এখানে সেখানে করে দিন কেটেছিল তৌকিরের। তবে যেখানেই থাকুক পরিকল্পনা মাফিক আন্দোলন চালিয়েছে তারা, কারণ সেই সময়ে ফেরার আর পথ নেই তাদের।

‎৪ আগস্ট ছিল তাদের অসহযোগ কর্মসূচির প্রথম দিন। ঐদিন তারা সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে আন্দোলন শুরু করেছিল। হঠাৎ ভিড়ের মাঝে সে সেদিনের ছেলেটিকেও দেখতে পেলো,গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিয়েছে ছেলেটি। হঠাৎ কোথা থেকে টিয়ার গ্যাস উড়ে এলো। তারপর শুরু হলো বুলেট বৃষ্টি। হঠাৎ এতো সবকিছুর মাঝে তৌকির একটু খেয়াল করতেই দেখতে পেলো সেই নাম না জানা ছেলেটি আর তার সমবয়সী কয়েকজন মিলে একজন আহত ছাত্রকে ঠেলেঠুলে আড়ালে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তৌকির একটু অবাক হলো, এতটুকু এতটুকু ছেলেপুলে যাদের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই, নেই তাদের সেই রকম কোনো বিচার বিশ্লেষণ ক্ষমতা তবুও হয়তো স্বৈরাচারের তাণ্ডবে বড় ভাইবোনেদের রক্তাক্ত দেহ আর সহ্য করতে পারিনি। এজন্য ঘর হতে হয়তো না বলেই বের হয়ে এসেছে। তৌকির এর আগেও বেশ কয়েকটা পথশিশুটিকে দেখেছে, যারা স্বৈরাচারী বাহিনীর উপর দূর থেকে ইট পাথর নিক্ষেপ করছিল, ছাত্রদের সাথে আন্দোলন করছিল। ওরা হয়তো খুব একটা বোঝে না, তবুও ওরাও আসলে দেশটার পরিবর্তন চায়, হয়তো নতুন করে বাঁচার সুযোগ চায়।

‎‎পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো, পুলিশ বাহিনী ধরাও পাকরাও অভিযান শুরু করলো। যাকে পাচ্ছে গাড়িতে তুলছে। তৌকির কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল। পুলিশ বাহিনী কিছুক্ষণ পরে সরে যেতেই একটি ভ্যানে সে বেশ কয়েকটি লাশ পাঁজামারা অবস্থায় দেখতে পেলো। হঠাৎ নাম না জানা ঐ পরিচিত ছেলেটির রক্তাক্ত হাত তৌকিরের হৃদয়ে অসহ্য পীড়ার তৈরি করলো। তৌফির কিছুটা বাকরুদ্ধ হলো। এই কয়দিনে তার বেশ কয়েকজন বন্ধু নিরুদ্দেশ, তার উপরে আকস্মিক এই ঘটনায় সে কিছুটা বিহ্বল হয়ে পরেছিল। জুলাই এসে সে এতো নিষ্ঠুরতা দেখেছে যার ছাপ হয়তো আজীবন থেকে যাবে, কখনো কখনো হয়তো তীব্র মানসিক যন্ত্রণাও দিবে তাকে। একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো তৌকির। তারা যখন আন্দোলনে নেমেছিল কখনো ভাবেনি এই আন্দোলন এতো দূরে গড়াবে। সারাদেশের সর্বশ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ, সর্বাবস্থায় ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর মনোভাব সত্যিই তাকে অনেক অবাক করেছে। অবাক করেছে এদেশ সংস্কারের জন্য মৃত্যুভয় ত্যাগ করা এদেশের মানুষের প্রতিবাদী মনোবল। ইতিহাস হয়তো একদিন এদেশের মানুষের এই আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লিখবে অথবা লিখবে না। কালো হাত ইতিহাস বিক্রি ও বিকৃত করার নেশায় অন্ধ হবে। শুধু রাজপথ আজীবন সাক্ষী হয়ে রয়ে যাবে নামহীন বহু শহীদের রক্ত ছাপ বুকে নিয়ে।

লেখক: দপ্তর সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে দ্বিমাসিক ডাকঘর পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।