বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল: সৌন্দর্যের আড়ালে সংকট, উত্তরণে করণীয় কি?

Author

মোঃ শরীফুল ইসলাম , Dhaka Central University, Dhaka College Campus, Dhaka.

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ১১ বার

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা মতই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের বাংলাদেশ। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিবেচনায় নিয়ে নিঃসন্দেহে বলা যায় দেশের প্রতিটি জেলা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। কবি সৈয়দ শামসুল হক এর ভাষায়, ধানের দেশ গানের দেশ তেরোশত এ নদীর দেশ বাংলাদেশ! অপরুপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কিশোরগঞ্জের বিস্তির্ণ হাওরাঞ্চল। হাওরের নাম শুনলেই প্রকৃতি প্রেমিদের ভ্রমণে যেতে মন আনন্দে- উল্লাসে মেতে উঠে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাওরের বিশাল জলরাশি। হাওরের বুকে ভাসমান গ্ৰাম গুলো দেখলে মনে হয় এ যেন নীল জলরাশির বুকে এক স্বর্গ রাজ্য। বিশেষত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মনমুগ্ধকর দৃশ্যগুলো দেখলেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট ৩৭৩টি হাওর আছে। এগুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলায় ৯৭টি হাওর রয়েছে। বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলা কে প্রবেশদ্বার বলা হয় । এছাড়াও দেশের সবচেয়ে নিচু জেলা হিসেবেও পরিচিত। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই অপরূপ সৌন্দর্য কি তারা স্বস্তিতে উপভোগ করতে পারে? কিভাবে শুরু হয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের পথচলা? সারাটা দিনই বা কেমন কাটে হাওড় অঞ্চলের মানুষের বেড়ে ওঠা?

হাওরের এই প্রাকৃতিক বিষ্ময়কর দৃশ্য কি তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে? ধারণা করা হয় ‘হাওর’ শব্দটি সংস্কৃত ‘সাগর’ শব্দ থেকে বিবর্তিত হয়েছে। ভাষাবিদদের মতে, সাগর হতে সায়র থেকে হাওর—এই ভাষাগত বিবর্তনের মাধ্যমে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। সাধারণত বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। যার ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বৃষ্টির জমে থাকা বিশাল জলরাশিকে দেখতে অনেকটাই সাগরের মতো মনে হওয়ায় গ্ৰামাঞ্চলে একে সাগর নামে ডাকতেন, যা আজ কালের আবর্তনে হাওর নামে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্ষা মৌসুমে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক ছুটে আসে হাওরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছু মুহূর্ত উপভোগ করার জন্য। অথচ হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন বৈচিত্র্যময়! প্রতিবছর প্রায় অর্ধেক সময় পানিতে আবদ্ধ থাকে এবং বাকি সময়টা থাকে শুষ্ক। বর্ষা মৌসুমের পরেই পানি সম্পূর্ণ রূপে শুকিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় বোরো মৌসুমে হাওরের কৃষকদের ধান চাষের উপযুক্ত সময়। সাধারণত আমাদের দেশের মাটি খুবই উর্বর। যার ফলে কৃষিকাজে তুলনামূলক কষ্ট কম হয়। পরবর্তীতে বীজতলা থেকে চারা তুলে নরম কাঁদা মাটিতে রোপণ করেন গ্ৰামের কৃষকরা। সাধারণত গ্রীষ্মকালে শুরু হয় কৃষকের সোনালী ধান ঘরে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা। এই সময়ে সোনালী ফসল ঘরে তুলতে হাওরের কৃষকরা ব্যস্ততম সময় অতিবাহিত করেন। ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই, ধান সিদ্ধ করা,শুকানো ও সংরক্ষণ করার কাজে সবাই ব্যস্ত থাকেন । বর্ষাকালে উজানে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীর পানি কানায়-কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। নদীগুলো প্রতিবছর বৃষ্টির পানির সাথে প্রচুর পরিমাণে পলি মাটি বয়ে আনে এবং নদীর তলদেশে জমা হয়। যার ফলে নদীর পানি সহজে চলাচল করতে পারে না এবং পলিমাটি জমতে-জমতে একসময় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়। ফলাফল স্বরূপ নদীর পানি উপচে পড়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে। হাওরে কৃষকের সোনালী ধান আগাম বন্যায় তলিয়ে যায়। কৃষকের মুখে হাসি নেই, হতাশা ও কষ্টে তারা জীবন যাপন করছে। অনেকে অন্যের জমি বর্গা এবং টাকা ঋণ নিয়ে প্রতিবছর চাষাবাদ করে থাকে। সাধারণ কৃষক তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে একদম নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত ‌। সাধারণ মানুষ জীবিকার তাগিদে গ্ৰাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দিচ্ছে । সাধারণ মানুষ শুধু গৃহহীন নয় বরং তাদের জীবন-জীবিকা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এছাড়াও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আমাদের দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণেও অনিয়ম দেখা যায় এবং বাঁধ নির্মাণে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার, ধান কাটার ব্যস্ততা শেষে হাওরবাসীর জীবনে দেখা দেয় এক বিষ্ময়কর ভিন্ন দৃশ্যপট। ফজরের আযানের পরে গ্ৰামের কয়েকজন যুবক ঐক্যবদ্ধভাবে ট্রলার নিয়ে হাওরে কোনাজাল পালায়। তারপর সেই কোনাজালে ছোট-বড় মাছ ধরা পড়ে। সকাল হওয়ার সাথে সাথেই মাছ নিয়ে বিক্রি করার উদ্দেশ্যে বাজারে যায়। মাছ বিক্রি করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অন্যদিকে অনেকেই ছোট ডিঙ্গি নৌকায় দুই একজন মিলে একসাথে বড়শি এবং জাল নিয়ে খুব ভোরে তারা ঘর থেকে বের হন মাছ ধরার উদ্দেশ্যে। আবার কেউ কারেন্ট জাল দিয়েও মাছ শিকার করে থাকে। অবশেষে মাছ ধরা শেষে নীড়ে ফিরে শুরু হয় মাছ রান্নার প্রস্তুতি। প্রতিদিন গরম ভাত আর তাজা মাছ হাওরের মানুষের যেন স্বস্তির খাবার। অনেকে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে জড়িত। বর্তমানে হাওরাঞ্চলে পর্যটন স্থানে স্পিডবোট ও নৌকা চালক, মোটরবাইক ও অটোরিকশা চালক এবং ট্যুর গাইড হিসেবে অনেকেই কাজ করছেন। অনেকে অস্থায়ী দোকান ও রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেও জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। হাওর অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃশ্য মনমাতানো হলেও মানুষের জীবন সংগ্রাম খুবই কষ্টদায়ক ও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একেক সময় হাওরে ভিন্ন রুপ ধারণ করে ফলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে তাদের বিভিন্ন সংকটের সম্মুখীন হতে হয়। সাধারণত বর্ষাকালে রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায় । বাংলায় একটি জনশ্রুতি আছে, বর্ষায় নাও শুকনায় পাও অর্থাৎ বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া চলাচল করার উপায় নেই আর শুকনো মৌসুমে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। যার ফলে নৌকা ছাড়া যাতায়াত অসম্ভব হয়ে পড়ে। হাওর অঞ্চলের মানুষের মধ্যে অনেকেই গবাদি পশু পালন করে । প্রতিবছর গবাদি পশু বিক্রি করে দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণ করে থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে প্রতিনিয়ত গবাদি পশু চুরি করে নিয়ে যায় এক শ্রেণীর ডাকাতেরা। মুহুর্তের মধ্যেই তারা পালিয়ে যায়। চারদিকে বিশাল জলরাশি থাকার কারণে অনেক সময় ডাকাতদের ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সম্প্রতি, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ছিনতাই-ডাকাতির পরিমাণ আগের চেয়ে অনেকটাই বেড়ে গেছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত হাওরের পর্যটকদের নৌকায় ডাকাতি করছে। বর্ষাকালে যারা ঘুরতে আসে অনেকের মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান জিনিসপত্র ডাকাতি করে নিয়ে যায়। ফলে হাওর অঞ্চলে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস এবং হাওরের মান ক্ষুন্ন হচ্ছে । শিক্ষা ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অনেকটাই ভিন্নধর্মী পরিবেশ বিদ্যমান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়লেও ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক। অন্যদিকে হাওর অধ্যুষিত উপজেলা কলেজ গুলোতে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা ব্যবস্থা। শুধু মানবিক ও ব্যবসা শিক্ষা বিভাগ নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেখানে নেই কোন বিজ্ঞান বিভাগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে লাইব্রেরি,শিক্ষক, ল্যাব ও পর্যাপ্ত গবেষণার চরম সংকট। হাওরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখলে মনে হয় এখনও সেই মান্ধাতার আমলে পড়ে রয়েছে। অথচ বর্তমান যুগ আন্তর্জাতিকতার যুগ। একটি উন্নত জাতি ও দক্ষ মানব হিসেবে গড়ে তুলতে বিজ্ঞান বিভাগের বিকল্প নেই। শিশুদের স্কুল কিংবা কলেজে যাওয়াও বন্ধ থাকে। বর্তমান আধুনিকতার যুগে এখনও হাওরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পিছিয়ে রয়েছে। চিকিৎসাকেন্দ্রে ডাক্তার,ঔষধ, ও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। সামান্য কোন রোগেও হাওরাঞ্চলের মানুষকে প্রতিনিয়ত শহরের চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে হয়। ফলাফল স্বরূপ, চিকিৎসা ব্যয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। প্রতিবছর বর্ষায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। অনেক গ্রামে চিকিৎসক থাকেন না। পানিবাহিত রোগ নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় সঠিক সময়ে চিকিৎসা কেন্দ্রে পৌঁছানো যায় না। হাওরাঞ্চলের মানুষ অনেকেই দরিদ্র শ্রেণীর। যার কারণে অনেকের ব্যাক্তিগত নৌকা কেনার সামর্থ্য নেই । এর ফলে অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যান। বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এই সময়টি অত্যন্ত মারাত্মক অবস্থা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা যখন সহজলভ্য নয়, তখন হাওরাঞ্চলের মানোন্নয়ন আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়। বর্তমান বিশ্ব যখন গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে এখনও হাওরাঞ্চলের মানুষ সেই আদিম কালেই পড়ে আছে। শহরাঞ্চলের মানুষ যখন ৪জি ও ৫জি ইন্টারনেট ব্যবহার করে তখন হাওরাঞ্চলের মানুষের নেটওয়ার্ক যেন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। প্রায় সময় হাওরাঞ্চলে গাছের মগডালে উঠেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষক নিরক্ষর ও দরিদ্র পরিবার থেকে বেড়ে ওঠে। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। পর্যাপ্ত জ্ঞান বা প্রশিক্ষণের অভাবে ফসলের জমিতে কৃষক প্রায় সময় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে। যার ফলে অনেক সময় হাওরের মিঠা পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট-বড় মাছ মারা যায়। এতে পরিবেশের ভয়াবহ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এছাড়াও প্রতিবছর হাওরের নিম্ন চাপের ফলে বাতাসে সৃষ্ট ঢেউয়ের ধাক্কায় বসতভিটা ভেঙ্গে পড়ে, যা টেকসইভাবে সংস্কার করতে প্রতিবছর হাওরবাসীকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। হাওর আমাদের দেশের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ। হাওর থেকে মাছ আহরণ করে অসংখ্য জেলেরা প্রতিনিয়ত জীবিকা নির্বাহ করে থাকে । বর্তমানে উন্মুক্ত নদী-নালা,খাল-বিল এর উপর একশ্রেণীর মানুষ আধিপত্য বিস্তার করছে । সরকারের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে জেলেদের কে বঞ্চিত করছে। যার ফলে অনেক জেলে পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের আরেকটি অন্যতম সংকট হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় না। বিশেষ করে গরমের সময়ে বিদ্যুৎ দৈনিক ২-৩ ঘন্টা পাওয়া যায়। এর ফলে হাওরবাসীর জন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। যার ফলে হাওরের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাত গুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সমস্যাগুলো সমাধান বা উত্তরণে করণীয় কি ? এই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কে নদী খনন করতে হবে। নদী খননের ফলে নদীর পানি ও বৃষ্টির পানি হাওড়ে জমে থাকবে না। নদীকে ঘিরে আমাদের বৃহৎ অর্থনীতি গড়ে উঠে। নদী বাঁচলে, বাঁচবে দেশ তাই নদীকে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। হাওরবাসীর জীবনমানের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সড়ক এমন ভাবে নির্মাণ করতে হবে যেন বর্ষাকালে পানিতে ডুবে না যায়। এজন্য উঁচু সড়ক বা উড়াল সেতু নির্মাণ করতে হবে। বর্ষাকালে নিরাপদে চলাচল করার জন্য পর্যাপ্ত নৌকার ব্যবস্থা করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের পাহাড়ি ঢল এবং আগাম বন্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা বা পরামর্শ দিতে হবে। সরকারিভাবে বন্যাসহনশীল ধানের বীজ বিতরণ করতে হবে । কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কেননা এই হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির সিংহভাগই আসে কৃষিখাত থেকে। হাওরে কৃষিকাজের পাশাপাশি দুগ্ধ উৎপাদন ও মৎস্য খামার গড়ে তুলতে হবে। কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত বাজার সুবিধা, সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করতে হবে। হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত টাকা উপার্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তখন কেউ সহজে হাওরাঞ্চল থেকে শহরে পাড়ি দিবে না। জেলেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সকল নদী-নালা খাল-বিল ও জলাশয় উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য হাওরাঞ্চলকে বাঁচাতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। এছাড়াও উঁচু স্থানে চিকিৎসা কেন্দ্র,আশ্রয় প্রকল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা প্রয়োজন। দুর্গম শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সুবিধা চালু করতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে হবে। এজন্য হাওর অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে মান সম্মত আধুনিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত মানসম্মত ডাক্তার, ঔষধ ও আধুনিক সরঞ্জাম থাকতে হবে। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষক, লাইব্রেরি, ল্যাব ও উপযুক্ত খেলার মাঠ থাকতে হবে। হাওরাঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌছে দিতে হবে। এজন্য হাওরে পর্যাপ্ত টাওয়ার নির্মাণ করতে হবে এবং একই সাথে নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। ডিজিটাল মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-কমার্স সেবা নিশ্চিত করতে হবে। হাওরাঞ্চলের মধ্যে বাল্যবিবাহ রোধ ও নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ করতে হবে। এজন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বাল্য বিবাহ বন্ধে এর কুফল সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে । ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা ও ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালু করা জরুরি। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে হবে। হাওরের পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত পরিমাণে পুলিশের টহল দিতে হবে। সর্বোপরি প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। হাওর বাসীর জীবন যাত্রার মানউন্নয়ন কোনো উপেক্ষিত বিষয় নয়, বরং এটা তাদের অধিকার । মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে বলেছিলেন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এই প্রার্থনাটি করেছিলেন চরিত্র ঈশ্বরী পাটনী। দেবী অন্নপূর্ণা তাকে বর চাইতে বললে তিনি ধন-সম্পদ বা বিলাসিতা না চেয়ে কেবল এই অকৃত্রিম প্রার্থনাটি করেছিলেন। অনুরূপভাবে হাওর বাসীও চায় সম্মান এবং সুযোগের সমতা। তারা চায় তাদের সন্তানরা যেন হাওর অঞ্চল থেকেও স্বপ্ন দেখতে পারে, আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারে যেন খুব সহজে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাওরের যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবহার দেশকে অর্থনৈতিকভাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাওর হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল। শুকনো মৌসুমে কৃষি ও পশুপালন। বর্ষায় মৎস্য ও পর্যটন। পরিকল্পিত ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিলে এই হাওর অঞ্চল জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

মোঃ শরীফুল ইসলাম। শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা কলেজ।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।