বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

টাকায় আঁকা বাংলার স্থাপত্য পুরাকীর্তি

Author

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (কুষ্টিয়া-৭০০৩)

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৪ পাঠ: ৩৪ বার

পৃথিবীর নানা দেশের মুদ্রার নকশায় বিষয়বস্তু হিসেবে চোখে পড়ে সেসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য এবং পুরাকীর্তি। তেমনি বাংলাদেশের টাকায়ও ১৯৭৬ সাল থেকে স্থান পেয়েছে দেশের নানা পুরাকীর্তির ছবি। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যক্তিগত সংগ্রহ অবলম্বনে টাকায় অঙ্কিত বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সব পুরাকীর্তি নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন – এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ 
তারা মসজিদ:
পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত তারা মসজিদ ‘চিনি-টিকরি’ নকশার এক অনন্য উদাহরণ। মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটির মাটি ছুঁয়ে থাকা দেয়াল ও মেঝে থেকে শুরু করে গম্বুজের চূড়ার শীর্ষ পর্যন্ত অনিন্দ্য সুন্দর নকশায় আবৃত। দুর্লভ প্রাচীন টাইলস, রংবেরঙের কাঁচের টুকরো, চিনা মাটির ফলকসহ নানাবিধ উপকরণ দিয়ে সুনিপুণভাবে মসজিদের সর্বাঙ্গ অলংকৃত করে তোলা। ১৯২৬ সালে সংস্কার করে মসজিদটির সাদা মার্বেল পাথরের গম্বুজ গুলোতে নীল রঙের অসংখ্য তারার নকশা যুক্ত করার কারণে লোকমুখে তখন থেকে মসজিদটি ‘তারা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। আনুমানিক ১৮ শতকের প্রথমদিকে এ মসজিদ নির্মাণ করেন জমিদার মির্জা গোলাম পীর। তখন অবশ্য স্থাপত্যটির নাম ছিল ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’। অপরূপ শোভা ছড়ানো মসজিদটি এই নকশার কারণেই মানুষের হৃদয় এবং ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এই কারণেই বাংলাদেশ সরকার সর্বপ্রথম ১৯৭৬ সালে এই মসজিদটিকে বিষয় করে ৫, ১০, ৫০, ১০০ ও ৫০০ টাকা নোটের একটা সিরিজ প্রকাশ করে। যার প্রতিটির মুখ্যদিকে স্থান পায় মসজিদটি। টাকায় তারা মসজিদের ছবি যুক্ত করার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের টাকায় কোন স্থাপনার ছবি যুক্ত করা হয়। পরের বছর তথা ১৯৭৭ সালের পরিবর্তিত নকশায়ও যথারীতি তারা মসজিদের উপস্থিতি দেখা যায়। বর্তমান বাজারে প্রচলিত বঙ্গবন্ধু সিরিজ নোটের ১০০ টাকার গৌণ দিকেও স্থান পেয়েছে অষ্টাদশ শতকের এ নিদর্শনটি। সে হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশের টাকার নকশায় স্থাপনা হিসেবে এককভাবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে পুরান ঢাকার এ পুরাকীর্তিটি।
লালবাগ কেল্লা:
ঐতিহাসিক তথ্যমতে শুরুর দিকে এ দুর্গ স্থাপনাটির নাম ছিল ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র যুবরাজ আজম শাহ বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হয়ে ঢাকায় আসেন ১৬৭৮ সালে। ঢাকায় এসে তিনি সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকাকে পর্তুগিজ ও মগদের থেকে রক্ষা করতে এই দুর্গ নির্মাণে হাত দেন। তবে দুর্গের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পূর্বেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য পিতা আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তাঁকে দিল্লিতে চলে যেতে হয়। ফলস্বরূপ বন্ধ হয়ে যায় দুর্গের নির্মাণ কাজ। পরবর্তীতে শায়েস্তা খাঁ বাংলার সুবাদার হয়ে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণ কাজে হাত দেন। কিন্তু শায়েস্তা খাঁর মেয়ে পরী বিবি মারা যাওয়ার কারণে চার বছরের মাথায় অসমাপ্ত অবস্থায় ১৬৮৪ সালে তিনি এর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। নির্মানাধীন এই দুর্গের অভ্যন্তরে মসজিদ এবং দেওয়ান-ই-আম এর মাঝখানে পরী বিবিকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীতে শায়েস্তা খাঁ তাঁর কন্যার স্মরণে উক্ত সমাধির উপর নির্মাণ করেন মনোমুগ্ধকর এক সমাধি সৌধ।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু করা তারা মসজিদের ছবি যুক্ত ১০০ টাকার নোটের গৌণ পিঠে স্থান পায় কষ্টিপাথর, মার্বেল পাথর আর রংবেরঙের টালির সমন্বয়ে মোগল আমলে নির্মিত এ ঐতিহাসিক নিদর্শন।
কুসুম্বা মসজিদ:
উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের সীমান্তবর্তী কৃষি নির্ভর জেলা নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে এই মসজিদের অবস্থান। গ্রামের নামানুসারে  পরিচিতি লাভ করেছে মসজিদটি। মসজিদের প্রবেশদ্বারের উপর স্থাপিত শিলালিপি অনুযায়ী সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ এর শাসনামলে ৯৬৬ হিজরী মোতাবেক ১৫৫৮- ৫৯ খ্রিস্টাব্দে জনৈক সোলাইমান নামক এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। ইট পাথরে নির্মিত ছয়টি গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি বাংলা স্থাপত্যরীতির এক অনন্য নিদর্শন। দেয়াল জুড়ে রয়েছে প্রাচীন টেরাকোটার কাজ। জ্যামিতিক নকশার আদলে পোড়ামাটির সুদৃশ্য কারুকাজ  দৃশ্যমান। মেহরাবে পাথর খোদাই করে বিচিত্র ফুল, লতাপাতা, ঝুলন্ত শিকল ও নান্দনিক শিল্পকর্ম মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী ও নন্দনতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করেই সর্বপ্রথম ১৯৭৮ সালে ৫ টাকা নোটের মুখ্য পিঠে খোদাইকৃত পাথরের নকশায় ব্যাপকভাবে অলংকৃত এই মসজিদের মেহরাবের ছবি স্থান পায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ৫ টাকার নোটের গৌণ পাশে পুরো মসজিদের ছবি অঙ্কিত হয়।
আতিয়া জামে মসজিদ:
সুলতানি ও মোগল স্থাপত্যের সমন্বয়ে নির্মিত প্রাচীন স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া জামে মসজিদ। চুন-সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত মসজিদটিতে টেরাকোটা ও ইট খোদাই করে ফুল, চক্রাকার রোজেট ও জ্যামিতিক নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে এই মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর কার্নিশ স্থানীয় কুড়েঘরের বাঁশের ফ্রেমের ন্যায় ধনুকের মতো বাঁকানো। এর ছাদ নির্মাণে বাংলার আদি ছনের কুঁড়েঘরের বাঁকানো চালের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত শিলালিপি হতে জানা যায়, ১০১৯ হি. (১৬১০-১১ খ্রি.) সালে শাহ বাবা আদম-কাশ্মীরীর সম্মানার্থে আতিয়া এলাকার শাসনকর্তা সাঈদ খান পন্নী মসজিদটি নির্মাণ করেন। এর স্থপতি মোহাম্মদ খাঁ। তবে মসজিদের বর্তমান প্রবেশ পথের উপরে আরেকটি শিলালিপি প্রোথিত রয়েছে। সেখানে নির্মাণের সাল উল্লেখ রয়েছে ১০১৮ হিজরী (১৬০৯ খ্রি.)।
১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো দশ টাকার নোটের সম্মুখ দিকে স্থান পায় এই প্রত্ন স্থাপনাটি। এরপর ১৯৮২ সালের পরিবর্তিত দশ টাকার নোট এবং ১৯৯৬ সালে বিজয় দিবসের রজত জয়ন্তী  উপলক্ষে ইস্যু করা প্রচলিত স্মারক (Circulated Commemorative) নোটের প্রচ্ছদেও স্থান পায় এই মসজিদের ছবি।
সাত গম্বুজ মসজিদ: 
ধারণা করা হয় ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দের দিকে সুবাদার শায়েস্তা খাঁর আমলে তার পুত্র উমিদ খাঁ বুড়িগঙ্গার তীরে  মসজিদটি নির্মাণ করেন। ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত এ মসজিদের গায়ে অন্যান্য মোগল স্থাপত্যের মতো তেমন কোনো কারুকাজ নেই। সাদামাটা দেয়ালে ছোট ছোট খোপ আর পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে। তবে এই মসজিদের স্থাপত্যে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তা হলো, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে বারান্দার মত বেশ খানিকটা জায়গা তৈরি করা। বিশেষজ্ঞদের মতে– মুসল্লিদের এবাদত-বন্দেগি শেষে নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য এই প্রশস্ত বারান্দা তৈরি করা হয়েছিল। মোগল আমলের পরে কোম্পানি শাসনের সময়ে জনবসতি কমে গিয়ে ঢাকার ধানমন্ডি, জাফরাবাদ এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে সাত গম্বুজ মসজিদও পরিত্যাক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে নবাব আহসান উল্লাহ জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদটি সংস্কার করেন। তিনি একজন মুয়াজ্জিনও নিয়োগ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ঐতিহাসিক এই মসজিদটিতে আবারও ধ্বনিত হচ্ছে আজানের সুর।
১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ৫০ টাকার নোটের নকশায় পরিবর্তন এনে শুধু তারা মসজিদের স্থলে এ মোগল স্থাপত্যটির (সাত গম্বুজ মসজিদ) ছবি যুক্ত করে ১৯৭৯ সালে পুনরায় বাজারে ছাড়া হয়। এছাড়াও ২০০০ সালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ছবি যুক্ত ৫০০ টাকা নোটের নকশায় সম্মুখ দিকে ঠিক মাঝ বরাবর ব্যবহৃত হয়েছে স্থাপনাটির ছবি। ২০০২ সালের পরিবর্তিত ৫০০ টাকা নোটের নকশায়ও পূর্বের স্থানেই বহাল থাকে সাত গম্বুজ মসজিদ।
ছোট সোনা মসজিদ:
১৫ গম্বুজ বিশিষ্ট এই স্থাপনাটিকে বলা হয় সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর রাজত্বকালে (১৪৯৩- ১৫১৯ খ্রি.) মনসুর ওয়ালী মোহাম্মদ বিন আলি নামে এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, মসজিদটির বাইরের দিকে একসময় সোনালী রঙের আস্তরণ ছিল। সূর্যের আলো পড়লে মসজিদটি সোনার মত চকচক করত। এছাড়াও প্রাচীন গৌড়ে একই রকম, তবে আকৃতিতে বড় আরেকটি মসজিদ ছিল। যার নির্মাতা সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ। এই কারণে স্থানীয় লোকজন আকৃতিতে বড় মসজিদকে বড় সোনা মসজিদ এবং আমাদের বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জের মসজিদটিকে ছোট সোনা মসজিদ বলে অভিহিত করত। এই মসজিদটির অলংকরণে মূলত ইট ও পাথরের টেরাকোটা ব্যবহার করা হয়েছে। তবে পাথরের উপর খোদাই করা নকশাই বেশি। ভিতর ও বাইরের দেয়ালে নকশা করা পাথরের টালি গুলো সোনা মসজিদ কে বাড়তি স্বকীয়তা প্রদান করেছে। দেশের পুরাকীর্তিতে টেরাকোটার ব্যবহার দেখা গেলেও পাথরের টালি ব্যবহার এ মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না।
১৯৭৯ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সরকার ২০ টাকা মূল্যমানের নোট বাজারে ছাড়ে। এই নোটটির মুখ্য দিকের প্রচ্ছদে স্থান পায় ছোট সোনা মসজিদ। পরবর্তীতে ২০০২ সালে পূর্বোক্ত নকশায় সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে পুনরায় বাজারে ছাড়া হয় ২০ টাকার নোট। এই নোটেও পূর্বের মতই একই জায়গায় শোভা পেতে থাকে ছোট সোনা মসজিদের ছবি।
লালবাগ কেল্লা মসজিদ:
লালবাগ দুর্গের পশ্চিম অংশে কেল্লা মসজিদ বা শাহী মসজিদ নামে পরিচিত এ মসজিদটি নির্মাণ করেন শাহজাদা আজম শাহ। ধারণা করা হয়, দুর্গের অভ্যন্তরে প্রথম স্থাপনা হিসেবে বানানো হয়েছিল এ মসজিদটি। মোগল স্থাপত্যরীতির বড় ধরনের প্রয়োগ ঘটে এই স্থাপত্যে। মসজিদটির তিনটি গম্বুজ। মাঝেরটি বড় আর পাশের দুটি একটু ছোট সম-আকারের। গম্বুজগুলো মসজিদের ভেতরে অষ্টকৌণিক ড্রামের আকারে নির্মিত। পুরো স্থাপত্যটি পলেস্তারায় আচ্ছাদিত এবং ভেতরে পাতার নকশা করা। পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে ছয়টি কুলুঙ্গি। পুরো মসজিদের সামনে এবং দুই পাশের দেয়াল ‘বন্ধ খিলান’ নকশায় অলংকৃত।
পুরান ঢাকার এই পুরাকীর্তি ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত দশ টাকা নোটের গৌণ দিকে স্থান পেয়েছে।
বাঘা মসজিদ:
১৫২৩ সালে রাজশাহীর প্রত্যন্ত বাঘা নামের জনপদে দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ। এটি শুধু মসজিদই নয়, বলা চলে এক দারুন ক্যানভাসও বটে। পুরো মসজিদ জুড়ে রয়েছে সুনিপুণ নকশাদার অপূর্ব সব টেরাকোটা। এসব টেরাকোটার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আম গাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতা সহ নানান প্রাকৃতিক কারুকাজ। মসজিদটিতে ফারসি স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব লক্ষণীয়। মসজিদের ওপরে রয়েছে মোট ১০ টি গম্বুজ এবং ৪টি মিনার। ভেতরে রয়েছে ছয়টি স্তম্ভ ও অপূর্ব কারুকার্য খচিত ৪ টি মেহরাব। পুরো মসজিদটি পোড়ামাটির ইট দিয়ে তৈরি। ইটের গাঁথুনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে চুন-সুরকি। পাঁচশো বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক এই নিদর্শন অপরূপ কারুকার্য সংবলিত টেরাকোটার নকশার জন্যই সুলতানি আমলের অন্যান্য স্থাপত্যের মধ্যে অনন্যতা লাভ করেছে। আর এ কারণেই মসজিদটি স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশের টাকায়।
১৯৯৯ সালে ৫০ টাকার নোটের পেছনের পিঠে প্রথমবার স্থান পায় প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম এই নিদর্শন। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে প্রকাশিত ৫০  টাকার নোটেও পূর্বের স্থানেই বহাল থাকে পুরাকীর্তিটি।
কার্জন হল:
১৯০৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন ঢাকায় ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তার নামানুসারেই ভবনের নাম দেওয়া হয় ‘কার্জন হল’। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরে ঢাকা কলেজের ক্লাস হতো ভবনটিতে। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। গাঢ় লালরঙা এ ভবনটি আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থাপত্যটির রঙ লাল হওয়ার পেছনে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে। তা হচ্ছে– মোগল সম্রাট আকবরের ফতেহপুর সিক্রির দিওয়ান-ই-খাসের অনুকরণে লাল বেলেপাথরের পরিবর্তে এ স্থাপনায় ব্রিটিশরা গাঢ় লাল ইট ব্যবহার করেছে। এ স্থাপনার মাধ্যমে ব্রিটিশরা প্রমাণ করতে চেয়েছে উপমহাদেশে তাদের অবস্থান আকবরের মতো। কেননা একমাত্র আকবরকেই তারা শ্রেষ্ঠ ও যোগ্য মোগল শাসক হিসেবে স্বীকার করত।
২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করে ১০০০ টাকার নোট। এই নোটটির গৌণ দিকের প্রচ্ছদে স্থান পায় ইন্দো-সারাসেনিক রীতিতে তৈরি গাঢ় লাল রঙের এই স্থাপত্যটি।
ষাট গম্বুজ মসজিদ:
১৫’শ শতকে নির্মিত এই পুরাকীর্তিটি বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলির মধ্যে বৃহত্তম এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলী দেখে অনুমেয়, সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ–এর শাসনামলে এটি নির্মাণ করেছেন যোদ্ধা ও পীর খান জাহান আলী। তিনি এটিকে ‘খলিফাতাবাদ’ রাজ্যের দরবার হল এবং জলোচ্ছ্বাস ও ঝড় ঝঞ্ঝার সময়ে রাজ্যের প্রজাদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে যা ষাট গম্বুজ মসজিদ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। এর নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ হলেও স্থাপনাটিতে ৭৭ টি গোল এবং ৪ টি চৌকোনা গম্বুজ সহ মোট ৮১ টি গম্বুজ বিদ্যমান। স্থাপনাটিতে ফুটে উঠেছে জৈনপুরী ও তুঘলকি  নির্মাণশৈলীর স্পষ্ট ছাপ। গৌরবময় ইতিহাস ও সৌন্দর্যের জন্য ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো স্থাপনাটিকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান’ (World Heritage site) হিসেবে ঘোষণা করে।
৬০০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খান জাহান আলীর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল এ নিদর্শনটি সর্বপ্রথম ২০০১ সালে ১০০ টাকার নোটে স্থান পেয়েছে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে প্রকাশিত ২০ টাকার নোটেরও বিষয় হয়েছে স্থাপনাটি।
লেখক: সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২০ জুলাই ২০২৪ তারিখে দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।