নির্বাক ষড়যন্ত্র : মুদ্রা ও ডাকটিকিটে ফিলিস্তিন
এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ

প্রতিটি মুদ্রা ও ডাকটিকিট সময়ের মুখে এঁকে যাওয়া একটি জাতির গল্প- যেখানে লেখা থাকে তাদের অহংকার, সংস্কৃতি ও স্বপ্ন। কিন্তু ফিলিস্তিনের গল্পটা ঠিক সেভাবে লেখা হয়নি। সেটি লেখা হয়েছিল পরাধীনতার কলমে, কাগজে ছিল পরাজয়ের ছাপ, আর অদৃশ্য কালি দিয়ে আঁকা ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রের মানচিত্র। ব্রিটিশ শাসকদের চক্রান্তে ফিলিস্তিনের মুদ্রা ও ডাকটিকিটে ‘চধষবংঃরহব’ নামের পাশে চুপিচুপি হিব্রু শব্দে ‘ইয়িশুভ’ শব্দ যুক্ত করা নিছক কোনো ভাষার অনুবাদ ছিল না, বরং তা ছিল ইতিহাস বদলে দেওয়ার এক কূটকৌশল। সেসব মুদ্রা ও ডাকটিকিট আজ সংগ্রাহকদের কাছে অমূল্য সম্পদ- কিন্তু একইসঙ্গে তা এক নিঃশব্দ আর্তনাদ, যা মনে করিয়ে দেয় কেমন করে দুনিয়ার প্রভাবশালী শক্তিগুলো সূক্ষ্ম কৌশলের মাধ্যমে একটি জাতির নাম, পরিচয় আর স্বপ্ন মুছে দেওয়ার নীরব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল।
যুদ্ধশেষে এক উপনিবেশ: শুরু হলো ম্যান্ডেট যুগ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ১৯২০ সালে জাতিপুঞ্জ ব্রিটেনকে দায়িত্ব দেয় ফিলিস্তিন শাসনের- যার অধীনে সৃষ্টি হয় “British Mandate for Palestine”। এটি কেবল প্রশাসনিক শাসন নয়, বরং ছিল এক কৌশলগত পরিবর্তন- যেখানে আরব ও ইহুদি উভয়ের সহাবস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা পরিণত হয় ইহুদি অভিবাসনের পথ সুগম করার এক কৌশলে। যার শিকড় গাঁথা ছিল বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration, 1917)-তে।
এই সময়েই চালু হয় “প্যালেস্টাইন পাউন্ড”- ব্রিটিশ পাউন্ডের সমমূল্যের স্থানীয় মুদ্রা। এর পাশাপাশি ডাক বিভাগ চালু করে দেশজ ডাকটিকিট, যাতে স্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয় “PALESTINE” শব্দটি।
স্ট্যাম্পের রেখায় উপনিবেশিক ষড়যন্ত্র
ব্রিটিশ ম্যান্ডেট কর্তৃপক্ষ ১৯২৭ সালে যে ডাকটিকিটগুলো চালু করে, সেগুলো দেখতে ছিল বেশ আকর্ষণীয়। গ্যালীল সাগরের দৃশ্য, ইয়াকুব (আ.) এর স্ত্রী রাহিলার সমাধিসৌধ, রক অব ডোম, ঐতিহাসিক ডেভিড মিনারের ছবি তাতে স্থান পায়। কিন্তু ছবির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল নামের উপস্থাপন- “PALESTINE (فلسطين)” ডাকটিকিটে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সঠিকভাবে লিখা হলেও হিব্রুতে ‘ফিলিস্তিন’ লিখতে শব্দটির পাশে বিশেষ বন্ধনীর মধ্যে অর্থাৎ “(פלשתינה – א״י)” অর্থাৎ “Eretz Yisrael”—ইহুদি জাতির ‘পবিত্র ভূমি’ কথাটির উল্লেখ করা হয়। যা ছিল আরবদের চোখে সুস্পষ্ট পক্ষপাত, কারণ প্রতীকী এই শব্দবন্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত চাতুরতার সাথে বিশ্ব দরবারে ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের ভূমি হিসেবে উপস্থাপন করে।
মুদ্রার ত্রিভাষিক কূটনীতি
একই সময়ে চালু হয় ‘প্যালেস্টাইন পাউন্ড’, যা ব্রিটিশ পাউন্ডের সমমানের ছিল। এ মুদ্রা ১,০০০ মিলসে (গরষং) বিভক্ত ছিল। ‘মিলস’ ছিল ফিলিস্তিনি মুদ্রার উপ-ইউনিট, অনেকটা বাংলাদেশের ১ টাকায় ১০০ পয়সার মতো। এসব মিলস মূলত রূপা, ব্রোঞ্জ ও কপার-নিকেল ধাতু দিয়ে তৈরি হতো। এই মুদ্রাগুলোর প্রতিটির একপাশে ছিল ইংরেজি, আরবি ও হিব্রু ভাষায় ফিলিস্তিন লেখা এবং ইংরেজি ও আরবিতে মুদ্রাটি জারির বছর উল্লেখ করা। অপর পাশে একই পদ্ধতিতে ৩ ভাষায় মুদ্রার মূল্যমান দৃশ্যমান ছিল। এই সময়েই ১, ৫, ১০, ৫০ এবং ১০০ পাউন্ড মূল্যমানের দৃষ্টিনন্দন কাগজের ব্যাংক নোটও ইস্যু করে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ফিলিস্তিনি কারেন্সি বোর্ড। ডাকটিকিটের মতো এসব ব্যাংক নোট এবং পয়সাতেও হিব্রু লেখাটির মধ্যেই ছিল প্যালেস্টিনা (ইয়িশুভ) লেখা; যার অর্থ হচ্ছে “Eretz Yisrael” বা ইহুদি জাতির ‘পবিত্র ভূমি’। যা সরাসরি আরব-ইহুদি রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ঘৃতাহুতি ফেলেছিল।
একটি মুদ্রায় একসাথে ছিল ইংরেজি, আরবি ও হিব্রু তিন ভাষা। তিন ভাষার এই সহাবস্থানে ছিল না সাম্যের ছোঁয়া। এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক নিঃশব্দ রাজনৈতিক বার্তা। উপনিবেশিক শাসনের সুচতুর কৌশল-যার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক অশান্ত পথে। শেষমেশ মুদ্রাটি হয়ে দাঁড়ায়, একখণ্ড ধাতবে খোদাই করা অনিবার্য সংঘাতের অলঙ্ঘনীয় ভবিষ্যদ্বাণী।
১৯৪৭: বিভাজনের ফাঁদ ও বিপর্যয়ের শুরু
জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালে প্যালেস্টাইন বিভাজনের যে প্রস্তাব দেয়, তাতে ইহুদিদের মাত্র ৬ শতাংশ জমির মালিকানা থাকলেও বরাদ্দ দেওয়া হয় মোট ভূমির ৫৫ শতাংশ। এই অন্যায্য পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় আরব বিশ্ব। এরপরই শুরু হয় জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলোর (হাগানা, ইরগুন, স্টার্ন) সামরিক হামলা। ৭ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাধ্য হয় ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে। ইতিহাস একে মনে রাখে ঘধশনধ নামে- ‘বিপর্যয়’।
এ বিপর্যয় শুধু ভৌগোলিক নয়, সাংস্কৃতিকও। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় ডাকঘর, মুদ্রানীতি, প্রশাসনিক পরিকাঠামো- সর্বোপরি এক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব।
সংগ্রাহকের চোখে হারানো রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর
এই মুদ্রা বা ডাকটিকিটগুলো কেবল সংগ্রহযোগ্য জিনিস নয়- এগুলো হচ্ছে এক অদৃশ্য রাষ্ট্রের প্রামাণ্য দলিল। একজন সংগ্রাহক হিসেবে যখন আমি এগুলো হাতে নিই, তখন আমার মনে হয় আমি একটি হারিয়ে যাওয়া সময়, একটি অচেনা আত্মপরিচয়, একটি নীরব রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বরকে স্পর্শ করছি।
যারা ইতিহাসের বই পড়ে প্যালেস্টাইনের নাম শুনেছেন, তারা যদি কখনো এ কয়েন বা ডাকটিকিট হাতে নেন, তবে বুঝবেন- একটি রাষ্ট্র কেবল মানচিত্রে নয়, তার মুদ্রায়, চিঠিতে, ডাকঘরে, জনগণের মননে বেঁচে থাকে।
একটি মুদ্রার ঘূর্ণনে ভেসে ওঠে জেরুজালেমের অলি-গলি। ক্ষুদ্র একটি ডাকটিকিট আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়ে, যখন ‘ফিলিস্তিন’ ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এক ভূখণ্ড- একটি নাম, একটি জাতিসত্তা।
রাষ্ট্র যখন কেবল স্মৃতি ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে, ফিলিস্তিন শব্দটি হারিয়ে যায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে। কিন্তু তার কয়েন আর স্ট্যাম্প, যেগুলোকে ব্রিটিশরা একসময় মাত্র লেনদেন ও পত্র-প্রেরণের উপকরণ ভেবে ছেপেছিল- আজ তারাই ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল। একটি রাষ্ট্র হয়তো অস্তিত্ব হারায়, কিন্তু তার ছাপ থেকে যায় ডাকটিকিটে, মুদ্রায়, ইতিহাসের ক্যানভাসে।
ফিলিস্তিন: চেতনায় মুদ্রিত এক উজ্জ্বল মানচিত্র
ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্র মানচিত্র থেকে মুছে গেছে, কিন্তু খুব কম রাষ্ট্র আছে, যারা তাদের নাম, ভাষা ও সংস্কৃতিকে মুদ্রা আর ডাকটিকিটে এত গভীরভাবে ধরে রাখতে পেরেছে। ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইনের নিদর্শনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র গঠনের লড়াই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং তা মুদ্রণযন্ত্রের শব্দে, কাগজের পাতায়, জনগণের প্রতীক্ষায়ও গড়ে ওঠে। এই কয়েন ও ডাকটিকিটের ভাঁজে আজও বেঁচে আছে এক অদৃশ্য রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা।
ফিলিস্তিনের এই মুদ্রা ও ডাকটিকিট শুধু ঐতিহাসিক স্মারক নয়, বরং তারা একটি হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের নীরব সাক্ষ্য। এই নিদর্শনগুলো প্রতিমুহূর্তে আমাদের মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র কেবল ভূগোল নয়, রাষ্ট্র একটি চেতনার নাম। আর সে চেতনা বেঁচে থাকে ধাতব মুদ্রার রেখায়, ডাকটিকিটের ক্ষুদ্র প্রান্তে, একজন সংগ্রাহকের নিঃশব্দ আবেগে।
